সাফারি বন্ধের দিনে পর্যটকদের জন্য নতুন গন্তব্য
জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান উত্তরবঙ্গের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকা তোর্সা নদীর তীরে পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এবং একশৃঙ্গ গণ্ডার-সহ নানা বন্যপ্রাণীর জন্য পরিচিত।
তবে সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে পর্যটকদের জন্য জঙ্গল সাফারি বন্ধ থাকে। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি বৃহস্পতিবার জলদাপাড়ায় গাড়ি ও হাতি সাফারি বন্ধ থাকার পাশাপাশি জঙ্গল এলাকার একাধিক পর্যটন পরিষেবাও বন্ধ থাকে। ফলে ওই দিনে পর্যটকদের জন্য বিকল্প আকর্ষণ তৈরি করতেই পর্যটন হাটের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ বৃহস্পতিবার জঙ্গল সাফারি না থাকলেও পর্যটকদের দিনটি যাতে একেবারে ফাঁকা না যায়, সেই ভাবনা থেকেই এই নতুন উদ্যোগ।
শালগাছের ছায়ায় বসবে হাট
শান্তিনিকেতনের সোনাঝুরি হাটের সঙ্গে জলদাপাড়া পর্যটন হাটের ভাবনায় মিল থাকলেও পরিবেশ একেবারেই আলাদা। এখানে শালগাছে ঘেরা সবুজ পরিবেশের মধ্যেই পর্যটকরা কেনাকাটা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
হাটটির মাধ্যমে শুধু পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। ডুয়ার্সের নিজস্ব জীবনযাত্রা, লোকঐতিহ্য এবং স্থানীয় মানুষের সৃজনশীলতাকেও পর্যটনের অংশ হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে জঙ্গল ও বন্যপ্রাণী দেখার পাশাপাশি ডুয়ার্সের মানুষের জীবন এবং সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগও তৈরি হবে পর্যটকদের জন্য।
প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩০টি স্টল
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০টি স্টল নিয়ে হাটের যাত্রা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন স্টলে স্থানীয়ভাবে তৈরি সামগ্রী থেকে শুরু করে কৃষিজ পণ্য ও খাবার পাওয়া যাবে।
হাতে তৈরি গয়না, শাড়ি, চাদর, স্থানীয় চাল, মধু-সহ নানা পণ্য থাকছে হাটে। পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে এমন সামগ্রী রাখা হচ্ছে, যা তাঁরা ডুয়ার্স ভ্রমণের স্মৃতি হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন।
স্থানীয় পণ্যকে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে এলাকার ছোট ব্যবসায়ী এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিও উপকৃত হতে পারে।
খাবারের তালিকাতেও ডুয়ার্সের স্বাদ
জলদাপাড়া পর্যটন হাটের অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে স্থানীয় খাবার। স্থানীয় মহিলাদের তৈরি পিঠা-পায়েস থেকে শুরু করে মাছের নানা পদ এখানে পাওয়া যাবে।
ডুয়ার্সের নিজস্ব রান্নার স্বাদ পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তোর্সা নদীর বোরলি মাছের পদও হাটের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
অর্থাৎ এই হাটে শুধু কেনাকাটা নয়, স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগও থাকছে। পর্যটকেরা চাইলে এক জায়গাতেই স্থানীয় পণ্য কেনার পাশাপাশি ডুয়ার্সের খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন।
স্থানীয় মহিলাদের স্বনির্ভরতার সুযোগ
পর্যটন হাটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ। উদ্যোক্তাদের আশা, হাটের মাধ্যমে স্থানীয় মহিলারা তাঁদের তৈরি পণ্য সরাসরি পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতে পারবেন।
বিশেষ করে হাতে তৈরি সামগ্রী, খাবার এবং কৃষিজ পণ্যের বাজার তৈরি হলে স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্থানীয় ছোট উদ্যোগগুলি উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পর্যটনকে শুধুমাত্র হোটেল, রিসর্ট বা সাফারির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করাই এই ধরনের উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পর্যটন ও স্থানীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন
ডুয়ার্সের পর্যটন মূলত বন, নদী, চা-বাগান এবং বন্যপ্রাণীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সরকারি পর্যটন তথ্যেও জলদাপাড়া, বক্সা, চিলাপাতা-সহ এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও বন্যপ্রাণীভিত্তিক আকর্ষণের কথা উল্লেখ রয়েছে।
নতুন হাট সেই পর্যটন অভিজ্ঞতার সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে যুক্ত করতে পারে। পর্যটকেরা জঙ্গলে সাফারি করার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি সামগ্রী এবং খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
এতে ডুয়ার্সের পর্যটনকে আরও বৈচিত্র্যময় করার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়মিত বসবে হাট
উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশেষ কোনও উৎসবের সময় শুধু এক-দুদিন নয়, প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়মিত হাট বসানো হবে। ফলে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
বিশেষ করে বৃহস্পতিবারকে বেছে নেওয়ার কারণ হল ওই দিন জলদাপাড়ার জঙ্গল ও সাফারি পরিষেবার নিয়মিত বিরতি। ফলে পর্যটকদের জন্য একটি বিকল্প দিনভর কার্যক্রম তৈরি করা সম্ভব হবে।
এই পরিকল্পনা কতটা জনপ্রিয় হয়, তার উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে স্টলের সংখ্যা বা হাটের পরিসর বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
পুজোর মরসুমে বাড়বে পর্যটকের ভিড়
দুর্গাপুজোর সময় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভিড় বাড়ে। ডুয়ার্সও সেই সময় পর্যটকদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য। জলদাপাড়ার মতো জায়গায় জঙ্গল, নদী ও বন্যপ্রাণীর আকর্ষণের পাশাপাশি এবার নতুন এই হাটও পর্যটন অভিজ্ঞতার অংশ হতে পারে।
বিশেষ করে যাঁরা পরিবারের সঙ্গে ডুয়ার্সে যাবেন, তাঁদের কাছে স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পের এই আয়োজন আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
তবে হাটের সাফল্য শুধু পর্যটকের ভিড়ের উপর নয়, স্থানীয় পণ্যের মান, দাম, পরিষেবা এবং নিয়মিত আয়োজনের উপরও নির্ভর করবে।
আগামী দিনে আরও উন্নয়নের পরিকল্পনা
হাটের উদ্বোধনের সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিকে আরও উন্নত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০টি স্টল দিয়ে শুরু হলেও ভবিষ্যতে পরিকাঠামো ও আয়োজনের পরিসর বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
হাটে আরও স্থানীয় শিল্পী, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং ছোট ব্যবসায়ীদের যুক্ত করা গেলে এর পরিধি আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হলে হাটটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, জলদাপাড়া পর্যটন হাট ডুয়ার্সের পর্যটনে নতুন একটি মাত্রা যোগ করার উদ্যোগ নিয়েছে। জঙ্গল সাফারি বন্ধ থাকার বৃহস্পতিবারকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় হস্তশিল্প, কৃষিজ পণ্য, খাবার ও সংস্কৃতিকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরাই এর লক্ষ্য। প্রায় ৩০টি স্টল দিয়ে শুরু হওয়া এই হাট আগামী দিনে কতটা জনপ্রিয় হয়, এখন সেটাই দেখার।



