অভিযোগের পর নজরদারিতে এভারেস্টের পণ্য
এভারেস্টের মশলা নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠেছে। এবার গুণমান পরীক্ষায় নির্ধারিত মান পূরণ না করায় সংস্থার হিং পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা FSSAI।
জানা গিয়েছে, এক গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন হিং প্রস্তুতকারক সংস্থার পণ্যের উপর নজরদারি শুরু হয়। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মুম্বই ও গুজরাটে এভারেস্টের কারখানা থেকে হিংয়ের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
পরীক্ষার পর সেই নমুনাগুলিতে নির্ধারিত মানের সঙ্গে বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এরপর সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
হিংয়ে কম পাওয়া গেল প্রয়োজনীয় নির্যাস
FSSAI-এর পরীক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হল হিংয়ে অ্যালকোহল-দ্রবণীয় নির্যাসের পরিমাণ।
নির্ধারিত মান অনুযায়ী, হিংয়ে অন্তত ৫ শতাংশ অ্যালকোহল-দ্রবণীয় নির্যাস থাকা প্রয়োজন। কিন্তু পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা এভারেস্টের হিংয়ের নমুনায় সেই মাত্রা পাওয়া যায়নি।
কিছু নমুনায় এই নির্যাসের পরিমাণ ছিল মাত্র ০ থেকে ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, নির্ধারিত মানের তুলনায় তা যথেষ্ট কম।
খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরীক্ষায় এই ঘাটতি ধরা পড়ার পর সংশ্লিষ্ট পণ্যের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপরই এভারেস্ট ফুড প্রোডাক্টসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়।
লালজি গোধুর হিংয়েও বড় গরমিল
শুধু এভারেস্ট নয়, লালজি গোধু-র তৈরি কাঁচা হিংয়ের নমুনাতেও গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সংস্থাটির কারখানা থেকে সংগৃহীত ছয় ধরনের কাঁচা হিং পরীক্ষা করা হয়। সেই নমুনাগুলিতে স্টার্চের পরিমাণ ছিল ১৫ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত।
অথচ নির্ধারিত মান অনুযায়ী হিংয়ে স্টার্চের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১ শতাংশ। ফলে পরীক্ষায় পাওয়া পরিমাণ নির্ধারিত সীমার তুলনায় অনেকটাই বেশি।
এই কারণেই লালজি গোধু-র তৈরি সংশ্লিষ্ট পণ্যের বিরুদ্ধেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবস্থা নিয়েছে।
বাজার থেকে নিম্নমানের পণ্য সরানোর নির্দেশ
গুণমানের পরীক্ষায় অনিয়ম ধরা পড়ার পর দুই সংস্থাকেই কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত খাদ্য নিরাপত্তা মান মেনে চলতে তারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি বাজারে ইতিমধ্যে পৌঁছে যাওয়া নিম্নমানের সংশ্লিষ্ট পণ্য তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। FSSAI-এর নির্ধারিত নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
অর্থাৎ, এটি আপাতত একটি সাময়িক পদক্ষেপ। সংস্থাগুলি নির্ধারিত মান পূরণ করতে পারলে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
আরও তিন মশলায় নিয়মভঙ্গের অভিযোগ
এভারেস্টের হিংয়ের পাশাপাশি সংস্থার আরও কয়েকটি মশলাতেও নিয়মভঙ্গের বিষয়টি পরীক্ষায় উঠে এসেছে।
এগ কারি মশলা, চিকেন মশলা এবং গরম মশলার নমুনাতেও অসঙ্গতি চিহ্নিত করেছে FSSAI। তবে এই তিনটি পণ্যের ক্ষেত্রে এখনও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি।
অর্থাৎ, পরীক্ষায় কিছু নিয়মভঙ্গের বিষয় সামনে এলেও এ মুহূর্তে ওই মশলাগুলির বাজারজাতকরণ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি নিয়ে সংস্থার কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
আগে বিদেশেও বিতর্কে জড়িয়েছিল এভারেস্ট
এভারেস্টের মশলা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য এই প্রথম নয়। এর আগেও বিদেশের বাজারে সংস্থার কয়েকটি পণ্য নিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন উঠেছিল।
কিছু দেশে এভারেস্টের মশলার নির্দিষ্ট ব্যাচ বা পণ্য নিয়ে কড়া পদক্ষেপের খবর সামনে এসেছিল। বিশেষ করে ফিশ কারি মশলায় ক্ষতিকর রাসায়নিক যৌগ থাকার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হংকং, সিঙ্গাপুর, নেপাল এবং আমেরিকায় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
তবে সেই ঘটনাগুলির প্রেক্ষাপট এবং এবার ভারতের FSSAI-এর পরীক্ষায় পাওয়া ত্রুটি এক নয়। এবার সরাসরি ভারতের খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরীক্ষায় এভারেস্টের হিংয়ের নির্ধারিত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে নজরদারি
সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে বিক্রি হওয়া মশলা ও খাদ্যপণ্যের গুণমান নিয়ে নজরদারি বাড়িয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। কোনও পণ্যে নির্ধারিত উপাদানের মাত্রা কম বা বেশি থাকলে কিংবা লেবেল ও উৎপাদন সংক্রান্ত নিয়ম ভাঙা হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এভারেস্ট ও লালজি গোধুর ক্ষেত্রে হিংয়ের নমুনায় পাওয়া অসঙ্গতি সেই নজরদারিরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি কী ব্যাখ্যা দেয় এবং নির্ধারিত মান পূরণ করতে কী পদক্ষেপ নেয়, তার উপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, এভারেস্টের হিংয়ে গুণগত মানের পরীক্ষায় বড়সড় অসঙ্গতি ধরা পড়ায় দেশের মশলা বাজারে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আপাতত সংশ্লিষ্ট হিং পণ্যে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। পাশাপাশি সংস্থার আরও কয়েকটি মশলার উপর নজর রাখছে FSSAI। আগামী দিনে পরীক্ষার রিপোর্ট ও সংস্থার জবাবের ভিত্তিতে আরও কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না, এখন সেটাই দেখার।



