সুপ্রিম কোর্টকে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে টেনে না আনার বার্তা দিলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। সোমবার আদালতে এক মামলার শুনানির প্রসঙ্গে তিনি জানান, চলমান প্রতিবাদ কর্মসূচির কারণে বিচারপ্রক্রিয়া কিংবা আদালতের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হওয়া উচিত নয়। আইনজীবী, আদালতের কর্মী, ক্লার্ক এবং মামলাকারীদের যাতায়াতেও যাতে কোনও সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রধান বিচারপতি জানান, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে আদালতের আপত্তি নেই। তবে তার জন্য নির্দিষ্ট স্থান বেছে নিতে হবে, আদালত চত্বরকে প্রতিবাদের জায়গা করা যাবে না।
আইনজীবীদের আটক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন
গত ১০ অক্টোবর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার Gyanesh Kumar-এর পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছিল। সেই কর্মসূচিতে একাধিক আইনজীবীকে আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দায়ের হয়েছে। সংবাদসূত্রের খবর, মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ওই আবেদন শোনার কথা রয়েছে।
সোমবার এই বিষয়টি আদালতে উত্থাপিত হলে প্রধান বিচারপতি আদালতের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় রাখার উপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্য, প্রতিবাদ কর্মসূচির জেরে বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনও ব্যাঘাত ঘটানো উচিত নয়। আদালতে যাঁরা মামলা নিয়ে আসেন, যাঁরা বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকেন কিংবা যাঁরা আদালতের প্রশাসনিক কাজ সামলান, তাঁদের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে।
প্রধান বিচারপতি আরও মনে করিয়ে দেন, প্রতিবাদ করা গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। Bar Council-এর সদস্যরাও প্রতিবাদে অংশ নিতে পারেন। কিন্তু সেই কর্মসূচি আদালত চত্বরে নয়, নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলে হওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, প্রতিবাদের অধিকার বজায় রেখেই আদালতের স্বাধীনতা ও স্বাভাবিক কাজকর্মকে সম্মান জানাতে হবে।
‘আদালতকে রাজনীতির মধ্যে টেনে আনবেন না’
প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের তাৎপর্য আরও বেড়েছে বিরোধী জোটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের আবেদন নাকচ হওয়ার পর। বিরোধী নেতারা ভোটে অনিয়মের অভিযোগ, Special Intensive Revision (SIR) প্রক্রিয়া বন্ধ করা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দিতে চেয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু সেই আবেদন রবিবার রাতে খারিজ হয়ে যায় বলে সংবাদসূত্রের দাবি। প্রধান বিচারপতির বক্তব্য ছিল, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এভাবে প্রশাসনিক স্তরে সাক্ষাৎ করার এক্তিয়ার আদালতের নেই। আদালতের মূল দায়িত্ব হল মামলা শোনা, আইন অনুযায়ী বিচার করা এবং রায় দেওয়া।
একই সঙ্গে আদালতের দরজা সব নাগরিকের জন্য খোলা রয়েছে এবং মৌলিক অধিকার রক্ষায় আদালত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—এই বার্তাও দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দাবি নিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎ না হলেও আইনি পথে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে না।
রাহুল গান্ধীর মামলার প্রস্তুতি
এই পরিস্থিতিতে লোকসভার বিরোধী দলনেতা Rahul Gandhi মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের পথে এগোচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমবার দুপুর তিনটেয় তিনি সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করবেন বলে দাবি করা হয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। সেই দাবির ভিত্তিতেই তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে মামলার প্রকৃত বিষয়বস্তু, আবেদনকারীদের তালিকা এবং আদালতে আবেদন জমা পড়েছে কি না, তা প্রকাশের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও আইনি লড়াই—দুটি পথেই বিরোধীরা নিজেদের দাবি সামনে আনতে চাইছে। প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ না পাওয়ার পরও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে বিরোধী শিবির বলে সংবাদসূত্রে দাবি করা হয়েছে।
‘দিল্লি চলো—মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’
সোমবার দুপুরে দিল্লিতে বিরোধী নেতাদের একটি পদযাত্রার কর্মসূচির কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে। দুপুর ১টা ৩০ মিনিট নাগাদ Connaught Place ও Barakhamba Road সংযোগস্থলে বিরোধী নেতারা জমায়েত হবেন বলে জানানো হয়েছে। এরপর Rahul Gandhi, Mamata Banerjee, Akhilesh Yadav, Tejashwi Yadav, Mallikarjun Kharge এবং Priyanka Gandhi-সহ একাধিক নেতার নেতৃত্বে পদযাত্রা হওয়ার কথা।
‘দিল্লি চলো—মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ নামে ওই কর্মসূচির ঘোষিত লক্ষ্য হল ভোটের স্বচ্ছতা, SIR প্রক্রিয়া এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি সামনে আনা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ না হলেও পদযাত্রা হবে এবং তার পর আইনি পদক্ষেপের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কর্মসূচির রুট, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং শেষ পর্যন্ত পদযাত্রা কোথায় শেষ হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আরও নির্ভুল হবে।
প্রতিবাদ ও বিচারব্যবস্থার সীমারেখা
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকারকে অস্বীকার করা হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, প্রতিবাদের কারণে আদালতের কাজকর্ম ব্যাহত হওয়া বা আদালতকে রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ করে তোলা গ্রহণযোগ্য নয়।
আইনজীবীদের আটক হওয়ার অভিযোগ নিয়ে পিটিশনের শুনানি এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মামলার অগ্রগতি—দুটি বিষয়েই এখন নজর থাকবে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। বিরোধীরা রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও আদালত স্পষ্ট করেছে, রাজনৈতিক দাবি এবং বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার নিজস্ব ক্ষেত্র আলাদা।
এই অবস্থায় প্রতিবাদকারীদের অধিকার, আদালতের স্বাভাবিক কাজকর্ম এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা—এই তিনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হয়ে উঠেছে মূল প্রশ্ন।
সম্পাদনা-সংক্রান্ত নোট: প্রকাশের আগে প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের হুবহু ভাষ্য, বিরোধী প্রতিনিধিদলের সাক্ষাতের আবেদন খারিজের কারণ, মঙ্গলবারের শুনানির তালিকা এবং Rahul Gandhi-র মামলার প্রকৃত অবস্থা সুপ্রিম কোর্টের সরকারি নথি বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করুন। নির্ধারিত কর্মসূচিকে সম্পন্ন হয়ে যাওয়া ঘটনা হিসেবে লেখা যাবে না।



