সন্ধ্যার ধসেই বন্ধ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক
শনিবার সন্ধ্যায় পশ্চিম সিকিমের রিম্বি গ্রামে আচমকাই বড় আকারের ভূমিধস নামে। পাহাড়ের উপর থেকে বড় বড় পাথরের চাঙড় গড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি নেমে আসে বিপুল পরিমাণ কাদা ও মাটির স্রোত।
এই ধসের জেরে ইউকসম-তাশিডিং এলাকার রিম্বি ও খেচুপরির মধ্যে যোগাযোগকারী রাস্তা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তার উপর পাথর এবং কাদার স্তূপ জমে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।
পাহাড়ি এলাকায় এমন পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন যাতায়াতও ব্যাহত হয়। জরুরি পরিষেবা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহণ নিয়েও সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অল্পের জন্য বড় বিপদ এড়াল এলাকা?
ভূমিধসের পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা নিয়ে। জানা গিয়েছে, ধস কবলিত জায়গার কাছেই দুটি বাড়ি রয়েছে। পাহাড়ের মাটি ও ঢাল আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ায় সেই বাড়িগুলিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়লে ফের মাটি ও পাথর নেমে আসতে পারে। ফলে শুধু রাস্তা নয়, বসতবাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশেষ করে রাতের সময়ে পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ধস নামলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
কয়েকদিন ধরেই ধসের কবলে সিকিম
শনিবারের ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েকদিন ধরে পশ্চিম ও দক্ষিণ সিকিমের একাধিক এলাকায় ভূমিধসের খবর সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার গভীর রাতে পশ্চিম সিকিমের রিম্বি-ইউকসম প্রধান সড়কেও বড়সড় ধস নামে। পাহাড় থেকে মাটি ও পাথর নেমে এসে ওই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ হয়েছিল।
তারপর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ সিকিমের গাংলা এলাকাতেও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। পরপর বিভিন্ন এলাকায় ধস নামায় পাহাড়ি সড়কগুলির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
একই সময়ে উত্তর সিকিমেও প্রকৃতির রুদ্ররূপ দেখা গিয়েছে। গত রবিবার সকালে ভূমিধসের কারণে চ্যাকুং ও তিস্তা নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় হড়পা বান নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়।
মিরিকেও ধসের পর তৈরি হয়েছিল নতুন উদ্বেগ
শুধু সিকিম নয়, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকাতেও সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিধসের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। মিরিক পাহাড়ে ধসের ফলে রংভাং নদীর গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে এবং সেখানে জল জমে গভীর হ্রদের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
পাহাড়ি এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় ধস নেমে নদীর গতিপথ আটকে গেলে আচমকা জলস্তর বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরবর্তীতে সেই বাধা ভেঙে গেলে নিচের দিকে দ্রুত জল নেমে গিয়ে হড়পা বান তৈরি হতে পারে।
ফলে সিকিম ও দার্জিলিং পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় বর্তমানে ভূমিধসের পাশাপাশি নদীর জলপ্রবাহের উপরও নজর রাখা হচ্ছে।
টানা বৃষ্টিই বড় কারণ
পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের অন্যতম প্রধান কারণ হল দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৃষ্টি। অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে পাহাড়ের মাটিতে জল ঢুকে তার বাঁধন দুর্বল হয়ে যায়। ঢালের স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে মাটি, পাথর এবং কাদা একসঙ্গে নীচে নেমে আসতে পারে।
পশ্চিম সিকিমে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির ক্ষেত্রেও টানা বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে।
শনিবার রিম্বিতে ধস নামার পরও যদি বৃষ্টি চলতে থাকে, তাহলে একই জায়গায় ফের ধস নামার আশঙ্কা থেকে যায়। পাশাপাশি আশপাশের অন্য অস্থিতিশীল ঢালগুলিতেও নতুন করে ধস নামতে পারে।
স্থানীয়দের যাতায়াতে বড় সমস্যা
রিম্বি-খেচুপরি সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় মানুষের চলাচলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে অনেক ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট সড়কই একাধিক এলাকার মধ্যে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। সেই রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প পথে যাতায়াত করতে হয়।
বিশেষ করে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আনা এবং জরুরি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
পর্যটনের দিক থেকেও এই ধরনের পরিস্থিতি উদ্বেগের। পশ্চিম সিকিমের বিভিন্ন এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াত রয়েছে। ভূমিধসের কারণে রাস্তা বন্ধ হলে পর্যটকদের চলাচলেও প্রভাব পড়তে পারে।
প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ
ধসের পরে রাস্তা পরিষ্কার করে যান চলাচল স্বাভাবিক করা প্রশাসনের কাছে প্রথম কাজ হলেও, তার সঙ্গে আরও বড় বিষয় হল পাহাড়ের ঢালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শুধু রাস্তার উপর পড়ে থাকা পাথর সরালেই সমস্যা মিটবে না। যদি উপরের ঢাল এখনও অস্থিতিশীল থাকে, তাহলে ফের পাথর বা মাটি নেমে এসে একই রাস্তা বন্ধ করে দিতে পারে।
তাই রাস্তা পরিষ্কারের পাশাপাশি ধসপ্রবণ এলাকাগুলির পরিস্থিতি নজরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাড়িগুলির বাসিন্দাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বৃষ্টি না কমলে বাড়বে আশঙ্কা
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বৃষ্টি। পাহাড়ে মাটি একবার অতিরিক্ত জল শুষে নিলে সামান্য অতিরিক্ত বৃষ্টিতেও নতুন করে ধস নামতে পারে।
রিম্বিতে ইতিমধ্যেই একটি বড় ধস নেমেছে। তার উপর আশপাশের ঢালও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধসের পরে এলাকা শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি থেকে যায়। তাই ভারী বৃষ্টি চলতে থাকলে স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দাদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সিকিমজুড়ে নজরে পাহাড়ি সড়ক
একদিকে পশ্চিম সিকিমের রিম্বি-খেচুপরি সড়ক অবরুদ্ধ, অন্যদিকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গত কয়েকদিনে ভূমিধসের ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
রিম্বি-ইউকসম, গাংলা এবং উত্তর সিকিমের একাধিক এলাকায় ধসের পর এখন পাহাড়ি সড়কগুলির উপর বিশেষ নজর রাখা জরুরি হয়ে উঠেছে।
পাহাড়ি রাস্তায় যাত্রার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ এবং রাস্তার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য জেনে তবেই বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিম সিকিমে শনিবারের ভূমিধস ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল পাহাড়ে বর্ষার বিপদ এখনও কাটেনি। রিম্বি-খেচুপরি সড়ক বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি দুটি বাড়ি ঝুঁকির মুখে পড়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা থাকায় আপাতত পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখাই সবচেয়ে জরুরি।



