নাজকা লাইন্সের উদ্দেশে যাত্রা, মাঝপথেই বিপর্যয়
শনিবার স্থানীয় সময় পেরুর পিসকো বিমানবন্দর থেকে একটি পর্যটকবাহী বিমান উড্ডয়ন করে। বিমানের নির্ধারিত গন্তব্য ছিল বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক বিস্ময় নাজকা লাইন্স, যা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক এই রহস্যময় ভূচিত্র আকাশপথে দেখার জন্য পেরুতে আসেন।
কিন্তু উড্ডয়নের কিছু সময়ের মধ্যেই বিমানটির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর বিমানটি নির্ধারিত গন্তব্যে না পৌঁছনোয় শুরু হয় তল্লাশি অভিযান।
উদ্ধার হল ধ্বংসস্তূপ
পরে অনুসন্ধানকারী দল পুয়েবলো ভিয়েখো এলাকায় বিমানটির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পায়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ, দমকল এবং জরুরি উদ্ধারকারী বাহিনী। কিন্তু সেখানে পৌঁছেই তাঁরা নিশ্চিত হন, দুর্ঘটনাটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে বিমানে থাকা কারও প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দুই পাইলট-সহ বিমানে থাকা মোট অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই পর্যটক ছিলেন বলে প্রশাসন জানিয়েছে। মৃতদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
বেসরকারি সংস্থার বিমান
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটি পেরুর বেসরকারি বিমান সংস্থা এরোডায়না পরিচালনা করছিল। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে নাজকা অঞ্চলে দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য বিশেষ পর্যটক উড়ান পরিচালনা করে আসছে।
নাজকা লাইন্স দেখার জন্য সাধারণত ছোট আকারের বিমান ব্যবহার করা হয়, যাতে যাত্রীরা আকাশ থেকে স্পষ্টভাবে বিশাল আকৃতির ভূচিত্রগুলি দেখতে পারেন।
কী কারণে ঘটল দুর্ঘটনা?
বিমানটি কেন ভেঙে পড়ল, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত শুরু করেছে পেরুর বিমান নিরাপত্তা ও অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
তদন্তকারীরা কয়েকটি সম্ভাব্য দিক খতিয়ে দেখছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
বিমানে কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না
ইঞ্জিন বা প্রযুক্তিগত সমস্যার সম্ভাবনা
আবহাওয়ার প্রভাব
পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ
উড্ডয়নের সময় কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না
বিমানের ব্ল্যাক বক্স ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে।
আবহাওয়াও সন্দেহের তালিকায়
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনার আগের দিন নাজকা অঞ্চলের আবহাওয়া স্বাভাবিক ছিল না। প্রবল দমকা হাওয়া, ঘন কুয়াশা এবং ঝোড়ো আবহাওয়ার কারণে দৃশ্যমানতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঘণ্টায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইছিল। ফলে উড্ডয়নের সময় আবহাওয়ার প্রতিকূলতা দুর্ঘটনায় কোনও ভূমিকা রেখেছে কি না, তাও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে কর্তৃপক্ষ এখনও নিশ্চিতভাবে আবহাওয়াকেই দায়ী করতে রাজি নয়। সমস্ত তথ্য সংগ্রহের পরেই চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে।
জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র নাজকা লাইন্স
পেরুর নাজকা মরুভূমিতে অবস্থিত নাজকা লাইন্স বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকায় আঁকা বিশাল আকৃতির বিভিন্ন প্রাণী, জ্যামিতিক নকশা এবং মানবাকৃতির চিত্রগুলি কেবল আকাশ থেকেই স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক ছোট বিমানে চেপে আকাশ থেকে নাজকা লাইন্স দেখার অভিজ্ঞতা নিতে আসেন। ফলে এই অঞ্চলে পর্যটকবাহী বিমান পরিষেবা অত্যন্ত জনপ্রিয়।
শোকের ছায়া পর্যটন মহলে
এই দুর্ঘটনার পর পেরুর পর্যটন শিল্পেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাজকা অঞ্চলে নিয়মিত পরিচালিত পর্যটক উড়ানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁদের পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে খবর দেওয়া হবে। পাশাপাশি মৃতদেহ শনাক্তকরণের কাজও চলছে।
তদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষা
দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা এবং পেরুর অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে তদন্তে নেমেছে। তদন্তকারীদের আশা, প্রযুক্তিগত তথ্য, রাডার রেকর্ড, আবহাওয়ার রিপোর্ট এবং ধ্বংসস্তূপ পরীক্ষা করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ দ্রুত জানা যাবে।
এর আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছোট পর্যটকবাহী বিমানের দুর্ঘটনা নিয়ে নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। পেরুর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরও সেই আলোচনাই আবার সামনে চলে এসেছে।



