কীভাবে তৈরি হয় পাসপোর্ট ইনডেক্স?
একটি দেশের পাসপোর্ট কতটা শক্তিশালী, তা সাধারণত নির্ধারণ করা হয় সেই পাসপোর্টের মাধ্যমে নাগরিকরা কতগুলি দেশে তুলনামূলক সহজে প্রবেশ করতে পারেন, তার ভিত্তিতে।
নতুন তালিকাতেও এই ধরনের ‘মোবিলিটি’ বা চলাচলের স্বাধীনতাকেই মূল মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়েছে। কোনও দেশের নাগরিককে কোনও গন্তব্যে যাওয়ার আগে ভিসার আবেদন করতে হচ্ছে কি না, বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর ভিসা পাওয়া যাচ্ছে কি না, অথবা ভিসা ছাড়াই প্রবেশ করা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
ভিসা নীতিতে কোনও পরিবর্তন হলে সূচকটিও সেই অনুযায়ী আপডেট করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের ২২৭টি দেশ ও অঞ্চলকে বিবেচনায় রেখে এই ধরনের পাসপোর্ট র্যাঙ্কিং প্রকাশ করা হচ্ছে।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি মূলত আন্তর্জাতিক যাতায়াতের সুবিধা পরিমাপের একটি সূচক। একটি দেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক সাফল্য বা আন্তর্জাতিক অবস্থানের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে এটিকে দেখা যায় না।
তালিকার শীর্ষে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী
নতুন সূচকে সবচেয়ে বেশি ‘মোবিলিটি স্কোর’ পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর পাসপোর্ট। UAE-এর স্কোর ১৮১।
এর অর্থ, তালিকার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী আমিরশাহীর নাগরিকরা মোট ১৮১টি গন্তব্যে তুলনামূলক সহজ ভ্রমণ সুবিধা পান। এর মধ্যে ১৩৮টি দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগে থেকে পাসপোর্টের জন্য ভিসা সংগ্রহের প্রয়োজন নেই বলে সূচকে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও ৪৩টি দেশে পৌঁছনোর পর ভিসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ ভ্রমণের আগে দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক ক্ষেত্রেই থাকে না।
তবে সব গন্তব্যের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ১৭টি দেশের জন্য UAE নাগরিকদের আগেই ভিসার আবেদন করতে হয়। ফলে শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে ভিসামুক্ত প্রবেশের সুবিধা নেই।
ভারতের অবস্থান ৭৩ নম্বরে
নতুন পাসপোর্ট ইনডেক্সে ভারতের স্থান ৭৩ নম্বরে। গত বছর ভারত ছিল ৬৬ নম্বরে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ভারতের অবস্থান সাত ধাপ নেমেছে।
ভারতের ‘মোবিলিটি স্কোর’ ৬৯। সূচক অনুযায়ী, ভারতীয় নাগরিকরা ২৫টি দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন। আরও ৩৯টি গন্তব্যে পৌঁছনোর পর ভিসা পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এর পাশাপাশি পাঁচটি দেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের ETA বা Electronic Travel Authorisation-এর সুবিধা রয়েছে। এই ব্যবস্থায় যাত্রার আগে অনলাইনে অনুমোদন নিতে হয়।
অন্যদিকে ১২৯টি দেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের আগে থেকেই ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়। ফলে বিশ্বের বেশ কিছু গন্তব্যে ভারতীয়দের ভ্রমণের আগে ভিসা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
কার সঙ্গে একই র্যাঙ্কে ভারত?
৭৩ নম্বরে একা ভারত নেই। নতুন তালিকায় জিম্বাবোয়ে, উগান্ডা এবং ভিয়েতনামের মতো দেশও ভারতের সঙ্গে একই অবস্থানে রয়েছে।
র্যাঙ্কিংয়ের এই অবস্থান মূলত বিভিন্ন দেশের ভিসা নীতি এবং ভারতীয় নাগরিকদের জন্য প্রবেশের শর্তের উপর নির্ভর করে। ফলে কোনও দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ বেশি হলেও তার প্রতিফলন সরাসরি এই সূচকে দেখা যাবে—এমনটা নয়।
পাসপোর্টের শক্তি মূলত সাধারণ নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে কতটা বাধা রয়েছে, সেই দিকটি তুলে ধরে।
কেন পিছল ভারতের র্যাঙ্ক?
ভারতের অবস্থান গত বছরের ৬৬ থেকে এবার ৭৩-এ নেমেছে। তবে শুধু র্যাঙ্কের পরিবর্তন দেখেই ভারতের পাসপোর্টের শক্তি কমেছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।
কারণ পাসপোর্ট ইনডেক্সে অন্য দেশগুলির ভিসা নীতির পরিবর্তনও র্যাঙ্কিংয়ে প্রভাব ফেলে। কোনও দেশ যদি ভারতের নাগরিকদের জন্য ভিসা সুবিধা পরিবর্তন করে, কিংবা অন্য দেশের নাগরিকদের জন্য নতুন ভিসামুক্ত সুবিধা চালু করে, তাহলে তার প্রভাব সংশ্লিষ্ট দেশগুলির অবস্থানে পড়তে পারে।
এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা নিজেদের নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও মাপকাঠি ব্যবহার করে পাসপোর্ট র্যাঙ্কিং তৈরি করে। তাই বিভিন্ন সূচকে একই দেশের অবস্থান এক নাও হতে পারে।
র্যাঙ্কিং নিয়ে ভারত সরকারের আপত্তি
ভারতের পাসপোর্টের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং প্রকাশিত হওয়ার পর ভারত সরকারের তরফেও এই ধরনের সূচক নিয়ে আপত্তির কথা জানানো হয়েছে।
৩১ জুলাই লোকসভায় এক লিখিত জবাবে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিং জানান, সরকার এমন কিছু র্যাঙ্কিং ও তালিকা সম্পর্কে অবগত, যেগুলি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা নিজেদের নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রকাশ করে।
অর্থাৎ সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, এই ধরনের র্যাঙ্কিংকে কোনও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি মূল্যায়ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোন বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, তার উপর ফলাফল নির্ভর করে।
এই কারণেই একটি নির্দিষ্ট পাসপোর্ট ইনডেক্সে ভারতের অবস্থান কমে যাওয়া মানেই ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানের সরাসরি অবনতি—এমন সিদ্ধান্ত টানা উচিত নয়।
তালিকার একেবারে শেষে আফগানিস্তান
নতুন তালিকায় সবচেয়ে কম ‘মোবিলিটি স্কোর’ পাওয়া দেশ আফগানিস্তান। দেশটির অবস্থান রয়েছে তালিকার একেবারে শেষে।
সূচক অনুযায়ী, আফগান নাগরিকরা মাত্র ছয়টি দেশে ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন। আরও ২৯টি গন্তব্যে পৌঁছনোর পর ভিসা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু বিপুল সংখ্যক দেশের ক্ষেত্রে তাঁদের আগে থেকেই ভিসার আবেদন করতে হয়। মোট ১৬৩টি গন্তব্যের জন্য আগাম ভিসা প্রয়োজন বলে সূচকে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক যাতায়াতের ক্ষেত্রে আফগান পাসপোর্টধারীদের উপর ভিসা-নির্ভরতা অনেক বেশি। এই কারণেই তালিকার নীচের দিকে দেশটির অবস্থান।
পাসপোর্ট শক্তিশালী হলে কী সুবিধা?
একটি শক্তিশালী পাসপোর্টের সবচেয়ে বড় সুবিধা আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে। আগে থেকে ভিসার আবেদন না করেই বেশি সংখ্যক দেশে যাওয়া গেলে ভ্রমণের প্রস্তুতি তুলনামূলক সহজ হয়।
ভিসা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাধারণত প্রয়োজনীয় নথি, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য তথ্য জমা দেওয়ার বিষয় যুক্ত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদন প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষও হতে পারে।
ভিসামুক্ত প্রবেশ বা অন-অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা থাকলে সেই প্রস্তুতির একটি বড় অংশ কমে যায়। ব্যবসায়িক সফর, পর্যটন কিংবা স্বল্পমেয়াদি আন্তর্জাতিক যাত্রার ক্ষেত্রেও এই সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে ভিসামুক্ত প্রবেশ মানেই কোনও দেশে সীমাহীনভাবে থাকার অনুমতি নয়। প্রতিটি দেশের নিজস্ব প্রবেশ ও থাকার নিয়ম থাকে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা বা অন্যান্য শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে।
র্যাঙ্কিং দেখার সময় কী মাথায় রাখবেন?
পাসপোর্ট র্যাঙ্কিং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুবিধা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। কিন্তু এর ভিত্তিতে কোনও দেশের নাগরিকদের সামগ্রিক জীবনযাত্রা, অর্থনীতি বা আন্তর্জাতিক অবস্থান বিচার করা যায় না।
একইভাবে র্যাঙ্কিংয়ের এক-দুই ধাপ ওঠানামার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অন্য দেশের ভিসা নীতি বদল, নতুন ভিসামুক্ত চুক্তি, ভিসা-অন-অ্যারাইভাল ব্যবস্থা বা সংশ্লিষ্ট সূচকের পদ্ধতিগত পরিবর্তন—সবই ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ভারতের ৭৩ নম্বর অবস্থানকে মূলত ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের জন্য বর্তমান আন্তর্জাতিক ভ্রমণ-সুবিধার একটি পরিমাপ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
সব মিলিয়ে, নতুন পাসপোর্ট ইনডেক্সে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী সবচেয়ে বেশি মোবিলিটি স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, আর আফগানিস্তান রয়েছে সর্বশেষে। ভারতের অবস্থান ৭৩, যেখানে গত বছর ছিল ৬৬। ২৫টি দেশে ভিসামুক্ত প্রবেশ, ৩৯টি দেশে অন-অ্যারাইভাল ভিসা এবং পাঁচটি দেশে ETA সুবিধা রয়েছে বলে সূচকে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ১২৯টি দেশের জন্য আগাম ভিসা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভারত সরকারও বেসরকারি সংস্থার তৈরি পাসপোর্ট র্যাঙ্কিংয়ের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে তালিকাটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুবিধা বোঝার একটি সূচক হলেও, এটিকে কোনও দেশের সামগ্রিক আন্তর্জাতিক অবস্থানের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে দেখা উচিত নয়।



