মুহূর্তে বদলে গেল শান্ত নদীর চেহারা
বুধবার সকাল পর্যন্ত যে নদী ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত, কয়েক মিনিটের মধ্যে সেটিই পরিণত হয় ভয়ংকর জলস্রোতে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের পাহাড়ি এলাকায় আচমকা নেমে আসে বিপুল পরিমাণ জল, কাদা, বরফ ও পাথর। সেই স্রোতের তোড়ে ভেসে যায় রাস্তার ধারের বাড়িঘর, সেতু এবং বহু বছরের পুরনো জনবসতি।
সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, পাহাড়ের গা বেয়ে বিশাল জলরাশি নেমে আসছে। কোথাও নদীর জল সেতুর উপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে, আবার কোথাও কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাড়িঘর কাদার স্রোতে ডুবে যাচ্ছে। বিপর্যয়ের ভয়াবহতা এতটাই বেশি যে, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার সুযোগও পাননি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের রাসুয়া জেলার রাসুয়াগাঢ়ি এলাকা। চিন সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই জনপদটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। নদীর দু’পাশে থাকা বিস্তীর্ণ এলাকায় বসতি রয়েছে। আচমকা বন্যার জেরে সেই জনপদের একটা বড় অংশ কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যাচ্ছে।
মৃত ১৬২, নিখোঁজ ৭৫০
বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নেপাল সরকার ১৬২টি দেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। তবে নিখোঁজের সংখ্যা এখনও অনেক বেশি। অন্তত ৭৫০ জনের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গিয়েছে।
নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানালের বক্তব্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক। ফলে ভারতের কাছেও এই বিপর্যয় অত্যন্ত উদ্বেগের হয়ে উঠেছে। নিখোঁজ ভারতীয়দের মধ্যে পর্যটক ও কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রী রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
কলকাতা থেকে যাওয়া ৩২ জনের একটি দলেরও এখনও খোঁজ মেলেনি। একইভাবে তামিলনাড়ুর ৩৭ জন পর্যটকের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পর্যটন সংস্থাগুলিও অনেক নিখোঁজ ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না।
পাহাড়ি এলাকায় রাস্তা, সেতু এবং যোগাযোগের পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপালি সেনা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালাচ্ছে। হেলিকপ্টারের সাহায্য নেওয়া হলেও বহু এলাকায় অবতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
কীভাবে তৈরি হল এত ভয়ংকর জলস্রোত?
বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে প্রথম থেকেই একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। কারণ, নেপালের উত্তরাঞ্চলে বিপর্যয়ের ঠিক আগে বড় ধরনের মেঘভাঙা বৃষ্টির খবর পাওয়া যায়নি। তাহলে এত বিপুল পরিমাণ জল এল কোথা থেকে?
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের সূত্রপাত তিব্বত সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায়। নেপালের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ তিব্বত সীমান্তে একটি ভূমিকম্প হয়। তার পরেই তুষারধসের ঘটনা ঘটে।
এই ভূমিকম্পের অভিঘাতেই কোনও হিমবাহ বা বরফের বিশাল অংশ ভেঙে পড়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই বরফ, পাথর এবং মাটি নদীর স্বাভাবিক গতিপথে বাধা তৈরি করলে সাময়িকভাবে জল আটকে থাকতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গেলে একসঙ্গে বিপুল জলরাশি নিচের দিকে নেমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
পাহাড়ি নদীর ক্ষেত্রে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ উঁচু এলাকা থেকে নিচে নামার সময় জলের সঙ্গে বরফ, পাথর, কাদা এবং ধ্বংসাবশেষ মিশে যায়। ফলে সাধারণ বন্যার তুলনায় সেই স্রোতের গতি ও ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেশি হয়।
লেহন্ডে খোলা থেকে ভোটেকোশী নদীতে
প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তিব্বত সীমান্তের একটি হিমবাহ ভেঙে যাওয়ার পর লেহন্ডে খোলা নদীর গতিপথ সাময়িকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। বরফ ও পাথরের স্তূপে জল আটকে গিয়ে পরে সেই বাধা ভেঙে যায়।
এরপর বিপুল পরিমাণ জল ও গলতে থাকা বরফ নদীর পথে নেমে আসে। সেই স্রোতের সঙ্গে কাদা ও পাথর মিশে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। লেহন্ডে খোলা নদী দিয়ে নেমে আসা জলরাশি পরে ভোটেকোশী নদীতে গিয়ে মেশে।
ক্রমশ জলের পরিমাণ এবং স্রোতের শক্তি বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেই জলরাশি রাসুয়া জেলার জনপদগুলিতে আছড়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তৈরি হয় ভয়াবহ হড়পা বান।
এখনও পর্যন্ত এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। ফলে ভূমিকম্প, তুষারধস, হিমবাহ ভাঙা এবং নদীর গতিপথে সাময়িক বাধা—ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় বিপর্যয় এত বড় আকার নিল, তা নিশ্চিতভাবে বলতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।
কৈলাসযাত্রীদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বহু ভারতীয় পর্যটক ও তীর্থযাত্রী নেপাল হয়ে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রা করেন। এই যাত্রার একটি বড় অংশ নেপালভিত্তিক পর্যটন সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এবারের বিপর্যয় সেই যাত্রীদের অনেককেই বিপদের মধ্যে ফেলেছে। রাসুয়াগাঢ়ি ও সীমান্তবর্তী এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অনেক দলের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা যোগাযোগ করতে পারছেন না।
কলকাতার ৩২ জনের দলটির নিখোঁজ থাকার খবর ইতিমধ্যেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অবস্থান জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। প্রশাসনের পাশাপাশি পর্যটন সংস্থাগুলিও নিখোঁজদের সন্ধানে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।
ভারতের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। নিখোঁজ ভারতীয়দের সংখ্যা এবং তাঁদের সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করতে নেপাল প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও প্রাণ আটকে থাকার আশঙ্কা
বিপর্যয়ের ভয়াবহতা দেখে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বহু বাড়ি কালো কাদা ও পাথরের নিচে চাপা পড়েছে। কোথাও আবার নদীর স্রোত পুরো রাস্তা এবং সেতু ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে।
ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলি ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে।
পাহাড়ি এলাকায় নতুন করে ধস নামার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদেরও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। নদীর জলস্তর এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতির উপর নজর রেখে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।
নেপাল ও ভারতের জন্য বড় সতর্কবার্তা
এই বিপর্যয় শুধু নেপালের জন্য নয়, গোটা হিমালয় অঞ্চলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। হিমবাহ, তুষারধস, আকস্মিক নদী অবরুদ্ধ হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সবকিছু মিলিয়ে পাহাড়ি এলাকায় হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের মতো ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতিতে কয়েকটি প্রাকৃতিক ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে বিপর্যয়ের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। একটি ছোট ভূমিকম্প বা তুষারধসও কখনও কখনও নদীর গতিপথ বদলে দিয়ে বিপুল জলরাশিকে নিচের জনপদগুলির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এই কারণে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। নদীর জলস্তর, হিমবাহের পরিবর্তন এবং সম্ভাব্য ভূমিধসের উপর নিয়মিত নজরদারি ভবিষ্যতে প্রাণহানি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এখনও চলছে উদ্ধার অভিযান
রাসুয়া ও সংলগ্ন এলাকায় এখন মূল লক্ষ্য নিখোঁজদের উদ্ধার এবং দুর্গত মানুষদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া। নেপালি সেনা ও স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলি ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে থাকা মানুষদের খোঁজ করছে।
তবে রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলিতে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও হেলিকপ্টারের সাহায্য নিতে হচ্ছে, আবার কোথাও পায়ে হেঁটে উদ্ধারকারী দলকে এগোতে হচ্ছে।
নিখোঁজের সংখ্যা বেশি হওয়ায় আগামী কয়েকদিন উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। বিশেষ করে ৩০০ ভারতীয়ের অবস্থান নিশ্চিত করা এখন দিল্লির কাছেও বড় অগ্রাধিকার।
সব মিলিয়ে, নেপালের এই ভয়াবহ হড়পা বান ইতিমধ্যেই দেশের অন্যতম বড় সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা ১৬২-তে পৌঁছলেও নিখোঁজদের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির ছবি স্পষ্ট হবে না। ভূমিকম্প, তুষারধস এবং হিমবাহ ভাঙার সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর উদ্ধার অভিযানের সাফল্যই এখন নির্ধারণ করবে, এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর আর কত প্রাণকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব।



