ধ্যান চলাকালীন মঠে হামলার অভিযোগ
শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টা নাগাদ মায়ানমারের মধ্যাঞ্চলের সাগাইং অঞ্চলে একটি বৌদ্ধ মঠে হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানা যাচ্ছে।
মিয়াউং টাউনশিপের সোয়েল লে ওহ গ্রামের ওই মঠে তখন সপ্তাহব্যাপী ধ্যানের আয়োজন চলছিল। সেখানে শতাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, মায়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি বিমান সেখানকার মঠ লক্ষ্য করে বোমা ফেলে। হামলায় অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে তিনজন মহিলা রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
১৫ মিনিটের ব্যবধানে দু’টি বোমা
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, বিমানটি প্রায় ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দু’টি বোমা ফেলেছিল।
একটি বোমার আঘাতে মঠ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। দ্বিতীয় বোমাটি মঠের কাছাকাছি একটি বাড়িতে গিয়ে পড়ে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে আশপাশের এলাকাতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হামলার পর স্থানীয় বাসিন্দারাই নিহতদের সমাধিস্থ করেন। এরপর নিরাপত্তার কারণে অনেকেই এলাকা ছেড়ে নিকটবর্তী একটি গ্রামে আশ্রয় নেন।
তবে হামলার বিষয়ে মায়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষের কোনও বিস্তারিত বক্তব্যের কথা এখনও সামনে আসেনি।
২০২১-এর অভ্যুত্থানের পর থেকেই গৃহযুদ্ধ
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মায়ানমারে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সশস্ত্র সংঘাত চলছে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও গণতন্ত্রপন্থী বাহিনীর সঙ্গে লড়াই অব্যাহত রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়মিত বিমান হামলা, ড্রোন হামলা এবং গোলাবর্ষণের অভিযোগ উঠছে সেনার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি নির্বাচন হলেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। প্রাক্তন সেনাকর্তা মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তির জয় নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টে নৃশংসতার অভিযোগ
মায়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাম্প্রতিক রিপোর্টেও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ছয় মাসে মায়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে অন্তত ৭০২ জন অসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ। নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন মহিলা এবং ১৫৩ জন শিশু রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোটের সময়সূচি ঘোষণার পর থেকে সামরিক বাহিনীর অভিযান আরও বেড়েছিল বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশ পর্যন্ত সেই পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই বৌদ্ধ মঠে হামলার অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাগাইং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মায়ানমারের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সাগাইং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চল। ঐতিহাসিকভাবেও এই এলাকার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সাগাইং জুন্টার অন্যতম প্রধান সংঘাতপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেনাবাহিনী এখানে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ।
এলাকাটিতে বিমান হামলার পাশাপাশি আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।
মঠেও নিরাপত্তা নেই, বাড়ছে আতঙ্ক
বৌদ্ধ মঠকে সাধারণত মায়ানমারের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের অন্যতম নিরাপদ স্থান হিসেবে দেখা হয়। সেই মঠেই ধ্যানরত মানুষের উপর হামলার অভিযোগ পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করছে।
এই ঘটনায় সত্যিই যদি সামরিক হামলা প্রমাণিত হয়, তাহলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্থাপনার সুরক্ষা নিয়ে ফের আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে পারে।
মায়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষ যে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়ে পড়েছেন, সাগাইংয়ের এই ঘটনাও তারই আরও একটি ভয়াবহ উদাহরণ।



