ভূমিধসে থমকে রংভং, তৈরি গভীর জলাধার
মিরিক বস্তি-২ এলাকায় পাহাড়ের বড় অংশ ধসে পড়ার জেরে রংভং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে যায়। পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর নদীর গতিপথ বন্ধ করে দেওয়ায় সেখানে জল জমতে শুরু করে।
ধসের জেরে মাঙ্গারজং চা বাগান, লোয়ার পালজারগাঁও এবং মিরিক বস্তি-২ এলাকার একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর উপর তৈরি হওয়া জলাধারটি প্রায় ৭০ মিটার চওড়া এবং প্রায় ৩ মিটার গভীর বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই জলাধার নিয়েই স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। পাহাড়ে ফের ভারী বৃষ্টি হলে জলস্তর দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। কোনওভাবে জলাধারের পাড় ভেঙে গেলে নিচের দিকে আচমকা জল নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণেই ঝুঁকি না নিয়ে আগেভাগেই জল বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুরু হয়েছে জল বের করার প্রক্রিয়া
কৃত্রিম হ্রদে জমে থাকা জল কীভাবে নিয়ন্ত্রিতভাবে সরানো যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের একটি দল কাজ শুরু করেছে। নদী বিশেষজ্ঞ এবং ইঞ্জিনিয়াররা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
জলাধারের পাড় কতটা শক্তিশালী, কোথা দিয়ে জল বের করলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব এবং অতিরিক্ত জল নামার সময় নিচের এলাকায় কোনও বিপদ তৈরি হবে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শুধু জল সরানোই নয়, পাহাড়ের আরও কোনও অংশ ধসে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হচ্ছে। কারণ নতুন করে ধস নামলে পরিস্থিতি আবার জটিল হয়ে উঠতে পারে।
প্রশাসনের লক্ষ্য, কোনও ধরনের আকস্মিক পরিস্থিতি তৈরি না করে ধীরে এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে জলাধারের জল কমানো। একইসঙ্গে নদীর গতিপথও যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
৩৩ পরিবারকে সরানো হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়ে
ভূমিধসের ঘটনায় লোয়ার পালজারগাঁও এলাকার ৩৩টি পরিবারকে ইতিমধ্যেই নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মোট ১২৪ জন বাসিন্দা বর্তমানে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নদীর কাছাকাছি এবং ধসপ্রবণ এলাকায় যাতে কেউ না যান, সেই নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
মিরিক থেকে শিলিগুড়ির দিকে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। রংভং নদীর জলস্তরে আচমকা পরিবর্তন হলে যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তার জন্য প্রশাসনের নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
হড়পা বান নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত কী?
রংভং নদীতে জলাধার তৈরি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে বড় ধরনের হড়পা বান নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ভূগোল গবেষকদের একাংশের বক্তব্য, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও নেপালে বা হিমবাহজাত হ্রদ ভেঙে যাওয়ার মতো বিধ্বংসী হড়পা বানের আশঙ্কা এখানে নেই।
চোপড়া কলেজের অধ্যক্ষ তথা ভূগোল গবেষক মধুসূদন কর্মকারের ব্যাখ্যা, রংভং কোনও হিমবাহজাত নদী নয়। সিঙ্গালিলা রেঞ্জের দক্ষিণ অংশে মাজুয়া বস্তি এলাকা থেকে নদীটির উৎপত্তি এবং পরে তা নেমে বালাসন নদীতে মিশেছে।
তাঁর মতে, রংভং নদীর জল ধারণ ক্ষমতাও সীমিত। ফলে জলাধার ভেঙে গেলেও ভয়াবহ হিমবাহজাত হড়পা বানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে নিচের দিকে প্লাবনের ধাক্কা সামলাতে হতে পারে।
অর্থাৎ বিশেষজ্ঞরা চরম বিপর্যয়ের সম্ভাবনা কম বললেও ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। সেই কারণেই প্রশাসন কোনও ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে আগাম সতর্কতাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখলেন রাজু বিস্তা
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে এলাকায় পৌঁছেছেন দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তা এবং কার্শিয়াংয়ের বিধায়ক সোনাম লামা। জেলাশাসক এবং পুলিশ সুপারকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি পরিদর্শন করেন।
উদ্ধার ও ত্রাণকাজে আরও গতি আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নদীর আশপাশের বাসিন্দাদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কৃত্রিম জলাধারের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও নিয়মিত পরিস্থিতির রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
রাজু বিস্তার বক্তব্য অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী নিজেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন। মাঠপর্যায়ে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়মিত জানানো হচ্ছে।
বুধবার থেকে শুরু ধস, শনিবারও বিপদ কাটেনি
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পাইলা গাঁও পাহাড়ের ঢালে বুধবার রাত থেকেই ভূমিধসের সূত্রপাত। শুক্রবার বড় অংশ ধসে পড়ে নদীতে। মাটি ও পাথরের স্রোত নদীর মধ্যে গিয়ে পড়ায় ধীরে ধীরে রংভংয়ের প্রবাহ আটকে যায়।
শনিবারও কিছু এলাকায় নতুন করে ধস নামার খবর পাওয়া যায়। ফলে শুধু তৈরি হওয়া জলাধার নয়, গোটা পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা নিয়েই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পাইলা গাঁও স্কুল দারা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান কিসমত সুব্বার বক্তব্য, তাঁদের বাড়ি থেকে প্রায় ৭০০ মিটার নিচে ধসের জায়গাটি। ধসের পর থেকেই নদীতে জল জমতে শুরু করে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে কী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
রংভংয়ের জল শেষ পর্যন্ত বালাসনে গিয়ে মেশে
রংভং নদীর ভৌগোলিক অবস্থানও প্রশাসনের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। নদীটি পাহাড় থেকে নেমে শিলিগুড়ির সমতলে বালাসন নদীর সঙ্গে মিলেছে।
ফলে পাহাড়ে কোনও বড় ধরনের জলপ্রবাহ তৈরি হলে তার প্রভাব নিচের দিকেও পড়তে পারে। নামসু, রংভং, দুধিয়া এবং তরাই অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে তাই উদ্বেগ রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর জল ধারণ ক্ষমতা কম হওয়ায় ভয়াবহ হড়পা বানের আশঙ্কা সীমিত। কিন্তু জলাধারের পাড় ভেঙে গেলে নিচের দিকে আকস্মিক প্লাবনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলিতে সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
গত বছরের বিপর্যয়ের স্মৃতি এখনও তাজা
উত্তরবঙ্গের মানুষ এখনও গত বছরের অক্টোবরের ভয়াবহ দুর্যোগের স্মৃতি ভুলতে পারেননি। প্রবল বৃষ্টিতে দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের একাধিক এলাকায় ভূমিধস নেমেছিল। মিরিক ও সুখিয়াপোখরি এলাকাতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল।
শিলিগুড়ি থেকে পাহাড়ে ওঠার রোহিণী রোডে বড় ধসের জেরে যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছিল। ১১০ নম্বর জাতীয় সড়কের কার্শিয়াংয়ের হুইটসেল খোলার রাস্তাতেও ভূমিধস নেমে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এছাড়াও শিলিগুড়ি-মিরিক রুটে দুধিয়া সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণেই এবার পাহাড়ে নতুন করে ধসের ঘটনা সামনে আসতেই প্রশাসন আগাম সতর্কতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সিকিমে তিস্তার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি
মিরিকে রংভং নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই উত্তর সিকিমের পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির খবর মিলেছে। ভূমিধসের জেরে তিস্তা এবং চ্যাকুং নদীপথ আটকে সেখানে যে জলাধার তৈরি হয়েছিল, তার জল অনেকটাই নেমে এসেছে।
সমতলের দিকে তিস্তার জলস্তরও সোমবার কমেছে। তবে নদীর জল এখনও ঘোলা রয়েছে। ফলে প্রশাসনের সতর্কতা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি।
তিস্তার জলস্তর এবং পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টির পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। কোথাও নতুন করে ধস নামছে কি না, নদীর প্রবাহে পরিবর্তন হচ্ছে কি না—সেসব বিষয়ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
পাহাড়-সমতল জুড়েই নজরদারি
মিরিকের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, পাহাড়ে একটি বড় ভূমিধসের প্রভাব শুধু স্থানীয় এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। নদীর গতিপথ বদলে গেলে তার প্রভাব নিচের সমতল এলাকাতেও পৌঁছতে পারে।
তাই মিরিক থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত নদী সংলগ্ন এলাকায় সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় রেখে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা চলছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কৃত্রিম হ্রদের জল কত দ্রুত এবং কতটা নিরাপদে বের করা সম্ভব হয়। একইসঙ্গে পাহাড়ে নতুন করে বৃষ্টি হলে জলাধারের পরিস্থিতি কীভাবে বদলায়, তাও নজরে থাকবে।
সব মিলিয়ে, মিরিকে রংভং নদীর গতিপথ আটকে তৈরি হওয়া জলাধার নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন ইতিমধ্যেই সক্রিয়। জল বের করার কাজ শুরু হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা পাড়ের স্থিতিশীলতা ও নদীর প্রবাহ পরীক্ষা করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে নিরাপদ জায়গায় সরানো হয়েছে। অন্যদিকে সিকিমে তিস্তার জলস্তর কমায় কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। তবে পাহাড়ি এলাকায় বর্ষার প্রকোপ পুরোপুরি না কমা পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতিতে নজরদারি বজায় রাখতেই হবে।



