মহড়ার আগে কেন ফের ক্ষেপণাস্ত্র?
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ৬টা নাগাদ উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূলের ওনসান এলাকা থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়। সেটি জাপান সাগরের দিকে উড়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে পড়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটির সঠিক ধরন, পাল্লা এবং উৎক্ষেপণের গতিপথ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
তবে সময়টা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী ১৭ আগস্ট থেকে আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ শুরু হওয়ার কথা। উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের মহড়াকে নিজেদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে দেখে আসছে। তাই যৌথ মহড়ার আগে পিয়ংইয়ংয়ের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কার্যত ওয়াশিংটন ও সিওলকে সতর্ক করার কৌশল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
এর আগেও একই ধরনের ঘটনা দেখা গিয়েছে। আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া যখন বড় আকারের সামরিক মহড়ার প্রস্তুতি নেয়, তখন উত্তর কোরিয়া প্রায়ই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখানো হয়, অন্যদিকে শত্রুপক্ষের উপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা চলে।
এবারও সেই পুরনো কৌশলই ফের সামনে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এক সপ্তাহে দ্বিতীয় পরীক্ষা
বুধবারের উৎক্ষেপণের আগে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানেই উত্তর কোরিয়া আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছিল। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যে পরপর এই ধরনের পদক্ষেপ পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক তৎপরতা যে বাড়ছে, তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিম জং উনের নেতৃত্বে উত্তর কোরিয়া গত কয়েক বছর ধরে ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করার পথে এগিয়েছে। স্বল্পপাল্লার অস্ত্র থেকে শুরু করে আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র—বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে দেশটি। এর মূল লক্ষ্য আমেরিকার সামরিক উপস্থিতিকে মোকাবিলা করার মতো সক্ষমতা তৈরি করা এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপের মধ্যে রাখা।
উত্তর কোরিয়ার দাবি, তাদের সামরিক কর্মসূচি আত্মরক্ষার জন্য। পিয়ংইয়ংয়ের যুক্তি, আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে সামরিক মহড়া চালিয়ে উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়ানো ছাড়া তাদের সামনে অন্য কোনও পথ নেই।
অন্যদিকে আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার বক্তব্য, এই মহড়াগুলি প্রতিরক্ষামূলক এবং মিত্রদেশগুলির সেনাদের প্রস্তুতি ও সমন্বয় বাড়ানোর জন্যই আয়োজন করা হয়।
এই পারস্পরিক অবিশ্বাসই কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনার অন্যতম প্রধান কারণ।
রাষ্ট্রসংঘের নিষেধাজ্ঞা, তবুও থামছে না পিয়ংইয়ং
উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একাধিক প্রস্তাবে পিয়ংইয়ংয়ের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মসূচিকে থামাতে পারেনি।
বরং কিমের শাসনে পরমাণু অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রকে দেশের নিরাপত্তা নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তোলা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার বক্তব্য, তাদের পারমাণবিক অস্ত্রই বিদেশি আক্রমণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা গ্যারান্টি।
সম্প্রতি দেশটির পরমাণু নীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের খবর সামনে এসেছে। বিদেশি হামলায় কিম জং উনের মৃত্যু হলে উত্তর কোরিয়া পালটা পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে—এমন কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু শত্রু রাষ্ট্রকে ভয় দেখানো নয়, উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের উপর সরাসরি আঘাতের সম্ভাবনাও প্রতিহত করতে চাইছে পিয়ংইয়ং।
অর্থাৎ কিমের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রে এখন শুধু ভূখণ্ড রক্ষা নয়, শাসক এবং রাজনৈতিক কাঠামো রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে সম্পর্কেও জোর
আমেরিকার সঙ্গে উত্তেজনা বজায় রাখার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়া গত কয়েক বছরে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও উল্লেখযোগ্যভাবে মজবুত করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতাও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে এসেছে।
চিনের সঙ্গেও সম্পর্ক শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কিম প্রশাসন। গত জুনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাত বছরের মধ্যে প্রথমবার উত্তর কোরিয়া সফর করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সফর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
ফলে একদিকে ওয়াশিংটন ও সিওলের সামরিক জোট, অন্যদিকে মস্কো ও বেজিংয়ের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের ঘনিষ্ঠতা—এই দুই মেরুর টানাপোড়েনে পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
মহড়া ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সামরিক মহড়া। সেনাবাহিনীর সমন্বয়, জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি যাচাই করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
কিন্তু উত্তর কোরিয়া বরাবরই এই মহড়াকে ভিন্ন চোখে দেখে। পিয়ংইয়ংয়ের আশঙ্কা, মহড়ার আড়ালে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সেই কারণেই মহড়ার আগে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুতি জানানোর রীতি উত্তর কোরিয়ার কাছে নতুন নয়।
বুধবারের ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ মানেই তাৎক্ষণিক যুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। উত্তর কোরিয়া বহুবার এই ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ঘনঘন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা আঞ্চলিক উত্তেজনা যে বাড়িয়ে দেয়, তাতেও সন্দেহ নেই।
বিশেষ করে জাপান সাগরের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ হওয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকার নজর এখন পিয়ংইয়ংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
নজরে কিমের পরবর্তী চাল
বিশ্বের অন্য প্রান্তে একাধিক সংঘাত চললেও কোরীয় উপদ্বীপের উত্তেজনা যে কমছে না, বুধবারের উৎক্ষেপণ তারই প্রমাণ। আমেরিকা-দক্ষিণ কোরিয়ার মহড়া শুরু হওয়ার আগে উত্তর কোরিয়া আরও কোনও অস্ত্র পরীক্ষা চালায় কি না, এখন সেটাই দেখার।
কিম জং উন অতীতে একাধিকবার সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল নিয়েছেন। তাই এবারের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণও শুধু সামরিক পরীক্ষা নয়, ওয়াশিংটন ও সিওলের উদ্দেশে একটি রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে।
মহড়া শুরু হলে উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া কী হয়, তার উপরই আগামী কয়েক সপ্তাহে কোরীয় উপদ্বীপের পরিস্থিতির অনেকটাই নির্ভর করবে। আপাতত এক সপ্তাহে দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে কিম স্পষ্ট করে দিলেন—আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক প্রস্তুতির সামনে পিয়ংইয়ংও যে নীরব বসে নেই, সেই বার্তাই দিতে চাইছে উত্তর কোরিয়া।



