মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত ফের নতুন মোড় নিল। এক মার্কিন সেনার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানের বিভিন্ন স্থানে আবারও বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, সাম্প্রতিক হামলায় মার্কিন সেনার প্রাণহানির পাশাপাশি কুয়েত, জর্ডন ও বাহরিনের মতো মিত্র দেশগুলির ওপর ইরান-সমর্থিত আক্রমণের জবাব দিতেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখাও অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
মার্কিন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, টানা কয়েকদিন ধরে চলা এই সামরিক অভিযানে ইরানের একাধিক কৌশলগত স্থাপনাকে নিশানা করা হচ্ছে। তবে অভিযানের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। নিরাপত্তাজনিত কারণে লক্ষ্যবস্তু এবং ক্ষয়ক্ষতির নির্দিষ্ট তথ্য গোপন রাখা হয়েছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
এই হামলার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, কোনও মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে তার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে এবং দায়ীদের কঠিন মূল্য দিতে হবে। সেই বার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন করে বিমান হামলা শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলের নজর আবারও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরেছে।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে ইরান বা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলি শুধু মার্কিন বাহিনীকেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলির নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কুয়েত, জর্ডন, বাহরিন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরান সরাসরি এই অভিযোগ স্বীকার করেনি। তবে দেশটির পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে, বিদেশি সামরিক উপস্থিতিই অঞ্চলের অস্থিরতার মূল কারণ। তেহরানের বক্তব্য, নিজেদের নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে। যদিও সর্বশেষ হামলার বিষয়ে ইরানের সরকারি প্রতিক্রিয়া এখনও বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়নি।
হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করেও উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহণ হয়। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে কোনও বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি বাজারে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তাদের নৌ ও বিমানবাহিনী সক্রিয় রয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও পড়তে শুরু করেছে। কুয়েত, জর্ডন, বাহরিন এবং কাতারের মতো দেশগুলি সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় বিভিন্ন দেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ইয়েমেনের পরিস্থিতি। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরব-সংক্রান্ত জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এই সমুদ্রপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা দেখা দিলে বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই বেড়ে যায়। ফলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথেই যদি নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পরিবহণ ব্যয় এবং সরবরাহ শৃঙ্খলেও তার প্রভাব পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
কূটনৈতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। একাধিক দেশ উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তাঁদের মতে, সামরিক পাল্টা হামলার বদলে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা জরুরি। কারণ সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আঞ্চলিক মিত্র, প্রক্সি গোষ্ঠী, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে এই সংঘাত এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী কয়েকদিনে দুই পক্ষের কূটনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে মার্কিন সামরিক অভিযান অব্যাহত, অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলিও পাল্টা অবস্থান থেকে সরে আসার কোনও ইঙ্গিত দেয়নি। ফলে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এখন নজর রাখছে, এই সংঘাত নতুন করে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হয় কি না।



