সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর বিদেশমন্ত্রকের দাবি, সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা তৈরি করতেই সেগুলিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। আবুধাবির বক্তব্য অনুযায়ী, মোট দুটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। তার মধ্যে একটি আমিরশাহীর জলসীমার মধ্যে এবং অন্যটি জলসীমার বাইরে গিয়ে পড়ে। হামলায় কোনও হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর না থাকলেও ঘটনাটিকে দেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখছে UAE সরকার।
এই পরিস্থিতিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যকলাপ এবং আর্থিক লেনদেন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমিরশাহী। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই আবুধাবির এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ UAE-এর
মঙ্গলবার UAE-এর বিদেশমন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পারস্য উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ব্যাহত করার উদ্দেশ্যেই ইরানের তরফে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। আমিরশাহীর দাবি, দুটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সমুদ্রপথে ছোড়া হয়েছিল। একটি তাদের জলসীমার ভিতরে গিয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয়টি সীমার বাইরে গিয়ে আঘাত হানে।
যদিও ঘটনায় কোনও জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা কেউ আহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে UAE সরকার মনে করছে, এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার জন্য বড়সড় বিপদ তৈরি করতে পারে।
আমিরশাহীর বিদেশমন্ত্রকের বক্তব্য, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা বা সেগুলিকে লক্ষ্য করে সামরিক হামলা চালানো কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সব অভিযোগ অস্বীকার তেহরানের
তবে UAE-এর সমস্ত অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আমিরশাহী যে অভিযোগ তুলেছে তার কোনও ভিত্তি নেই। ইরানের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা তৈরির প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ইরানের বক্তব্য, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির উচিত পরস্পরের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ না তুলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া। তেহরানের এই প্রতিক্রিয়ার পর স্পষ্ট, আপাতত দুই দেশের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে কোনও সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়নি।
ফলে কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে UAE এবং ইরানের সম্পর্ক ফের কঠিন পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। এর প্রভাব শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের উপরও পড়তে পারে।
যুদ্ধের পর থেকেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই আমিরশাহী ইরানের হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বলে দাবি করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর UAE-এর দিকে বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার অভিযোগ রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে আমিরশাহীর দিকে প্রায় ৩ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের তুলনায় ইরানের সামরিক হামলার বড় চাপ UAE-কে সামলাতে হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে গত জুনে একটি সমঝোতার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছিল। সেই সময় আমিরশাহীর উপর হামলা বন্ধ থাকার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কমার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ওই সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি ফের বদলাতে শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ সেই উত্তেজনাকেই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। UAE-এর তরফে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করার সিদ্ধান্ত তারই প্রতিফলন বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহণ করা হয়। উপসাগরীয় দেশগুলির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই জলপথের উপর নির্ভরশীল।
ইরান ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে শান্তিচুক্তি না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখার অবস্থান থেকে তারা সরে আসবে না। এই ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মহলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী-সহ উপসাগরীয় দেশগুলির অর্থনীতি সমুদ্রপথের বাণিজ্যের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি পরিবহণের খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে পণ্য সরবরাহে বিলম্ব—একাধিক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক চাপের আশঙ্কা
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করার ফলে দুই দেশের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়বে। UAE দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। ইরানের সঙ্গে তার বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক ও আর্থিক যোগাযোগ রয়েছে।
তাই রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক প্রভাবও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আমিরশাহী আপাতত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিলেও দীর্ঘদিন এই নিষেধাজ্ঞা চললে ব্যবসায়িক মহলে তার প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের উপরও এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের একটি অংশ UAE-কে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক অর্থনীতির উপর চাপ বাড়তে পারে।
কূটনৈতিক সমাধানই এখন বড় প্রশ্ন
ক্ষুদ্র পরিসরের সামরিক ঘটনা থেকে শুরু হওয়া এই উত্তেজনা যাতে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। UAE একদিকে নিজের জলসীমা ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে ইরান অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিবেশী দেশগুলিকে সংযত থাকার বার্তা দিয়েছে।
ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার উপর নির্ভর করছে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে কি না, সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
বর্তমানে UAE-এর বাণিজ্য স্থগিতের সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংঘাতের আবহে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়, নাকি উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও বড় অস্থিরতা তৈরি হয়—এখন সেটাই দেখার।



