মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত। কয়েকদিন ধরে চলা পালটা হামলার আবহে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের সরকারি সূত্রের দাবি, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে মার্কিন বাহিনী। হামলার লক্ষ্য ছিল একাধিক সেতু, একটি রেলস্টেশন, বিমানবন্দর এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। প্রাথমিক হিসাবে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে যে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা সফল না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে জানিয়েছিলেন, প্রয়োজন হলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করা হবে। ইরানের দাবি, সেই হুঁশিয়ারির পরই শুরু হয়েছে ধারাবাহিক হামলা।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক উপকূলীয় এলাকা এই হামলার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আহভাজ, কেশম, বুশেহর, দাশতি, বোস্তান, সিরিক, বন্দর-এ-লেঙ্গেহ এবং বন্দর-এ-খামির সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হামলায় অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি একটি রেলস্টেশন এবং একটি বিমানবন্দরেও আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
হরমুজগান প্রদেশের প্রশাসন জানিয়েছে, সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে বলে সরকারি হিসাব। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালগুলিতে ভর্তি করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার ফলে কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার ও জরুরি পরিষেবার কাজে কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। উপকূলবর্তী দ্বীপাঞ্চলেও বিস্ফোরণের প্রভাব অনুভূত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
অন্যদিকে, হামলার পরপরই পালটা প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে ইরান। তেহরানের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। জর্ডানে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার খবর সামনে এসেছে। এছাড়াও বাহরিন, কুয়েত ও অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতির জেরে কাতার প্রশাসনও সতর্কতা জারি করেছে। সাধারণ নাগরিকদের অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, বিমানবন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামোর আশপাশে। কারণ, কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে সেই অঞ্চলও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সাম্প্রতিক সংকটের সময়ে কাতার এবং পাকিস্তান উভয়ই মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিল। হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা কমাতে একাধিক কূটনৈতিক বৈঠক হলেও শেষ পর্যন্ত কোনও সমঝোতা হয়নি। ফলে পরিস্থিতি আরও সংঘাতমুখী হয়ে ওঠে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর। একইসঙ্গে পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
ভারতের ক্ষেত্রেও এই পরিস্থিতি উদ্বেগের। দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পশ্চিম এশিয়া থেকে। ফলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে পরিবহণ, উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় কর্মরত ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়েও নজরদারি বাড়িয়েছে নয়াদিল্লি। যদিও এখনও পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতির কোনও সরকারি তথ্য সামনে আসেনি, তবুও পরিস্থিতির উপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মহলেও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশ উভয় পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি, নিহত ও আহতের সংখ্যা এবং পালটা অভিযানের পরিধি নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে তদন্ত এবং সরকারি আপডেটের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট ছবি সামনে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে একথা স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে।



