আমেরিকা-ইরান সংঘাতের মাঝে কূটনৈতিক সক্রিয়তা দেখানোর পর এবার আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানাল পাকিস্তান। রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার আমেরিকার কাছে প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি আর্থিক সহায়তা ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। ইসলামাবাদের দাবি, এই সহায়তা দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।
জানা গিয়েছে, মার্কিন অর্থ সচিব স্কট বেসেন্টের কাছে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে একটি দ্বিপাক্ষিক ‘মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীলকরণ সহায়তা ব্যবস্থা’ চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থার আওতায় দুই দেশের মধ্যে আর্থিক সহযোগিতা তৈরি হবে এবং এর মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
বর্তমানে পাকিস্তানের অর্থনীতি একাধিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক ঋণের চাপ, কমে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার এবং রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যায় রয়েছে দেশটি। আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার (আইএমএফ)-এর কাছ থেকেও বিপুল ঋণ নিতে হয়েছে ইসলামাবাদকে।
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাকিস্তানের বর্তমান আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ২০২৬ অর্থবর্ষে পাকিস্তান সরকারের আয় প্রায় ৫৮ বিলিয়ন ডলার হলেও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৮ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে শুধু ঋণ পরিশোধের জন্যই বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সরকারকে।
সরকারি ঋণের চাপও পাকিস্তানের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা। তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ঋণের দায় মেটাতেই প্রায় ৯২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে নতুন অর্থের জোগান না পেলে দেশের আর্থিক পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পাকিস্তান সরকার।
এই পরিস্থিতিতেই আমেরিকার সঙ্গে আর্থিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের যুক্তি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে এবং সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল হিসেবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা পাওয়া উচিত।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরানকে ঘিরে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। সেই উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করে। ইসলামাবাদের উদ্যোগে এক পর্যায়ে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি তৈরি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
কিছুদিনের মধ্যেই ফের সংঘাত শুরু হয় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে। বর্তমানে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
পাকিস্তান মনে করছে, এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই এবার ওয়াশিংটনের কাছে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে শাহবাজ শরিফের সরকার।
তবে আমেরিকা এই প্রস্তাবে কী প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ওয়াশিংটন আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে কতটা আগ্রহী হবে, সেটাই এখন নজরের বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এই ধরনের বড় সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি সহজ হবে না।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের জন্য এই অর্থনৈতিক সহায়তা শুধু আর্থিক স্বস্তিই নয়, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক অবস্থান মজবুত করার চেষ্টাও হতে পারে। আগামী দিনে আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়, তার উপরও নির্ভর করবে এই প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ।



