পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ঘিরে নতুন করে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জেলে থাকা পিটিআই প্রতিষ্ঠাতার শারীরিক অবস্থা নিয়ে আগেও একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এবার তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে বিস্ফোরক দাবি করলেন পাকিস্তানের সাংবাদিক ওয়াহাজাত সইদ খান। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে তিনি জানিয়েছেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কয়েকজন উচ্চপদস্থ আধিকারিকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই এমন আশঙ্কার কথা সামনে আনছেন। তবে এই দাবি এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইমরান খানের দুই ছেলে কাশিম ও সুলেমান সম্প্রতি বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারার বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় সাত মাস ধরে তাঁরা বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। শুধু পরিবারের সদস্যরাই নন, ইমরানের চিকিৎসক এবং আইনজীবীরাও তাঁর সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। ফলে জেলে বন্দি প্রাক্তন পাক প্রধানমন্ত্রীর প্রকৃত শারীরিক অবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সাংবাদিক ওয়াহাজাতের দাবি আরও জল্পনা বাড়িয়েছে। তাঁর বক্তব্য, রাওয়ালপিণ্ডিতে পাকিস্তানের সামরিক সদর দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি ইমরানের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। অন্তত তিনজন আধিকারিকের সঙ্গে কথা বলার দাবি করেছেন তিনি। ওই তিনজনের বক্তব্যে পার্থক্য থাকলেও, ইমরান আর জীবিত নেই—এমন আশঙ্কার কথা তাঁরা জানিয়েছেন বলে দাবি সাংবাদিকের।
ওয়াহাজাত নিজেই অবশ্য জানিয়েছেন, ওই আধিকারিকদের কেউ ইমরানের মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেননি। তাঁরা যে তথ্য পেয়েছেন, তার ভিত্তিতেই এমন ধারণা করছেন। ফলে তাঁর বক্তব্যের মধ্যেই অনিশ্চয়তার বিষয়টি স্পষ্ট। ইমরানের মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের তরফে কোনও সরকারি ঘোষণা বা নির্ভরযোগ্য স্বাধীন সূত্রের নিশ্চিত তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
ইমরান খানের পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে সরব। গত ৫ আগস্ট ইমরানের কারাবাসের তিন বছর পূর্ণ হয়। সেই সময় একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তাঁর দুই ছেলে কাশিম ও সুলেমান জানান, বাবার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ কার্যত বন্ধ। তাঁদের দাবি, পরিবার, চিকিৎসক কিংবা আইনজীবী—কেউই ইমরানের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে পারছেন না।
ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কারণও রয়েছে বলে দাবি করেছে তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই। দলটির অভিযোগ, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে না। ইমরানকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমনিতেই উত্তপ্ত। তাঁর দীর্ঘ কারাবাস এবং তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলাকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত অব্যাহত রয়েছে।
২০২৩ সালের আগস্টে ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর থেকে বিভিন্ন মামলায় তাঁর কারাবাস দীর্ঘায়িত হয়েছে। একাধিক মামলায় আদালতের রায়, জামিন এবং নতুন করে মামলা—এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই তিনি জেলে রয়েছেন। তাঁর সমর্থকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক কারণেই তাঁকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রশাসন ও সরকারের অবস্থান বরাবরই আলাদা।
এবারের বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ইমরানের বর্তমান অবস্থান। তাঁর পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিন দেখা করতে না দেওয়া এবং তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্যের অভাব থেকেই গুজব ও জল্পনা আরও ছড়াচ্ছে। পিটিআইয়ের পক্ষ থেকেও ইমরানের শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।
ইমরানের মৃত্যু নিয়ে জল্পনা অবশ্য এই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সমাজমাধ্যমে তাঁর মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থতার খবর ছড়িয়েছে। পরে সেগুলির কিছু ভুয়ো বা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই এবারও সাংবাদিকের দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার আগে সরকারি বা স্বাধীন সূত্রের বক্তব্যের অপেক্ষা করা জরুরি।
তবে ইমরানকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ কমেনি। তাঁর মুক্তির দাবিতে বড়সড় কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে পিটিআই। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে একটি মিছিল শুরু করার ডাক দেওয়া হয়েছে। সেই মিছিল আদিয়ালা জেলের দিকে এগোবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
এর পাশাপাশি, ওই কর্মসূচির আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লং মার্চের পরিকল্পনাও করেছে পিটিআই। দলটির দাবি, ইমরানের মুক্তি, পরিবারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের সুযোগ এবং তাঁর চিকিৎসার দাবিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নামবেন। পিটিআইয়ের তরফে দাবি করা হয়েছে, এই কর্মসূচিতে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের সমাগম হতে পারে।
ইমরান খানের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা এবং পাকিস্তানে তাঁর সমর্থকদের শক্তি বিবেচনায় এই কর্মসূচি নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে যদি সরকারি ভাবে স্পষ্ট কোনও তথ্য না আসে, তাহলে জল্পনা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ইমরান খান আসলে কোথায় এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা কেমন। সাংবাদিক ওয়াহাজাত সইদ খানের দাবি সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে। কিন্তু সেনা আধিকারিকদের কাছ থেকে পাওয়া বলে দাবি করা তথ্যের বাইরে এখনও পর্যন্ত ইমরানের মৃত্যুর কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
ফলে এই মুহূর্তে তাঁর মৃত্যুর খবরকে নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া যাচ্ছে না। পাকিস্তান সরকার, জেল কর্তৃপক্ষ কিংবা ইমরান খানের পরিবারের তরফে কোনও স্পষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি দাবির স্তরেই থাকছে। তবে দীর্ঘ সাত মাস পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়া এবং তাঁর চিকিৎসা নিয়ে পিটিআইয়ের অভিযোগ পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে যে আরও অস্থির করে তুলছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।



