থিমের নামেই রয়েছে চমক
বর্ধমানের সুভাষ অ্যাথলেটিক ক্লাব পরিচালিত অরবিন্দ পল্লি সর্বজনীন দুর্গোৎসব এবার ৭৬তম বছরে পা দিয়েছে। এই বছর পুজোর মূল থিম—‘বাহন বন্দে ভারত ভূস্বর্গে মা’। থিমের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা। সাধারণ মণ্ডপে হেঁটে গিয়ে প্রতিমা দর্শনের বদলে এবার দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা হবে একটি ছোট্ট ট্রেনযাত্রার।
উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মণ্ডপের বাইরে তৈরি হবে রেললাইন, স্টেশন এবং প্ল্যাটফর্ম। সেই রেলপথে থাকবে Vande Bharat-এর আদলে তৈরি একটি ট্রেন। দর্শনার্থীরা নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠবেন এবং যাত্রা শেষে মণ্ডপের সামনে থাকা অন্য স্টেশনে নেমে প্রতিমা দর্শন করবেন।
২৫০ মিটার রেললাইন, দু’টি স্টেশন
পুজো কমিটির সম্পাদক অঙ্কন গুহ জানিয়েছেন, প্রায় ২৫০ মিটার রাস্তার উপর রেললাইনের আদলে পরিকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। রেলপথের এক প্রান্তে থাকবে একটি স্টেশন ও প্ল্যাটফর্ম। অন্য প্রান্তে, অর্থাৎ মণ্ডপের সামনে তৈরি হবে দ্বিতীয় স্টেশন।
দর্শনার্থীদের জন্য গোটা ব্যবস্থাটিকে বাস্তব ট্রেনযাত্রার মতো করে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। স্টেশনে পৌঁছে প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে উঠবেন তাঁরা। এরপর ট্রেন চলবে নির্দিষ্ট রেলপথ ধরে। যাত্রার শেষেই পৌঁছে যাবেন দুর্গাপ্রতিমার মণ্ডপের সামনে।
অর্থাৎ পুজোমণ্ডপে পৌঁছনোটাই এবার হয়ে উঠছে আলাদা এক আকর্ষণ। সাধারণ দর্শনার্থীদের পাশাপাশি শিশুদের কাছেও এই অভিজ্ঞতা বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করতে পারে বলে আশা উদ্যোক্তাদের।
থাকবে তিনটি কামরা, জেনারেল ও VIP ব্যবস্থা
উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনায় ট্রেনটিকেও Vande Bharat Express-এর আদলে তৈরি করা হচ্ছে। মোট তিনটি কামরা থাকবে বলে জানিয়েছেন পুজো কমিটির কর্মকর্তারা। তার মধ্যে দুটি থাকবে জেনারেল কম্পার্টমেন্ট এবং একটি থাকবে VIP কম্পার্টমেন্ট।
ক্লাবের আর এক কর্মকর্তা কিংশুক ঘোষের দাবি, ট্রেনটির নকশা এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে আসল Vande Bharat-এর সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য চোখে না পড়ে। ট্রেনের বাইরের কাঠামো থেকে শুরু করে সামগ্রিক উপস্থাপনায় আধুনিক এক্সপ্রেস ট্রেনের আবহ তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
ফলে পুজো দেখতে গিয়ে দর্শনার্থীরা শুধু একটি ট্রেনের মডেল দেখবেন না, বরং সেই ট্রেনে উঠে মণ্ডপ পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগও পাবেন।
ট্রেনযাত্রার শেষে ‘ভূস্বর্গে’ মা দুর্গা
এবারের থিমের দ্বিতীয় বড় চমক মণ্ডপের ভিতরে। ট্রেনযাত্রার পর দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হবে কাশ্মীরের পরিবেশ। বরফে ঢাকা পাহাড়, শীতল আবহ এবং ভূস্বর্গের অনুভূতি তৈরি করাই মণ্ডপসজ্জার অন্যতম লক্ষ্য।
উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনায়, Vande Bharat যেন দর্শনার্থীদের নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে কাশ্মীরে। আর সেই ‘ভূস্বর্গে’ রয়েছে মা দুর্গার প্রতিমা। তাই গোটা থিমের নামের মধ্যেই ট্রেন ও কাশ্মীর—দুই ভাবনাকে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
মণ্ডপের ভিতরের এই পরিবেশ তৈরির কাজও জোরকদমে চলছে। প্রতিমা দর্শনের আগে ও পরে দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা একটি আবহ তৈরি করতে চাইছেন উদ্যোক্তারা।
একচালার প্রতিমাতেও থাকছে নতুনত্ব
শুধু মণ্ডপ বা ট্রেন নয়, প্রতিমাতেও বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। অরবিন্দ পল্লির এবারের প্রতিমা হবে একচালার। তবে ঐতিহ্যবাহী কাঠামোর সঙ্গে থিমের সামঞ্জস্য রেখে প্রতিমা উপস্থাপনায় নতুনত্ব আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ আধুনিক Vande Bharat এবং কাশ্মীরের বরফে ঢাকা পরিবেশের পাশাপাশি দুর্গাপ্রতিমার ক্ষেত্রে বাংলার চেনা ঐতিহ্যও বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। আধুনিক থিমের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী একচালার প্রতিমার এই সমন্বয়ই এবারের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হতে পারে।
উত্তর ২৪ পরগনা থেকে আসছে ‘বন্দে ভারত’
অরবিন্দ পল্লির এই বিশেষ ট্রেন তৈরির দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার শিল্পীরা। জানা গিয়েছে, সেখান থেকেই আসবে Vande Bharat-এর আদলে তৈরি ট্রেনটি।
শুধু ট্রেন নয়, পুজোর আলোকসজ্জার দায়িত্বও উত্তর ২৪ পরগনার শিল্পীদের হাতে। ফলে মণ্ডপের মূল ভাবনার সঙ্গে আলোকসজ্জাকেও একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সাজানো হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, ট্রেন, রেললাইন, স্টেশন, আলো এবং কাশ্মীরের পরিবেশ—সবকিছুকে একসঙ্গে মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ গল্প তৈরি করা। যাতে মণ্ডপে ঢোকার আগেই দর্শনার্থীরা থিমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারেন।
দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা
বর্তমানে প্যান্ডেল তৈরির কাজ জোরকদমে চলছে। রেললাইন, স্টেশন এবং ট্রেনের পাশাপাশি মণ্ডপসজ্জার বিভিন্ন কাজও এগিয়ে চলেছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, দর্শনার্থীদের শুধুমাত্র প্রতিমা দেখানো নয়, তাঁদের একটি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়াই এবারের মূল লক্ষ্য।
স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠা, রেলপথ ধরে যাত্রা এবং শেষ পর্যন্ত মণ্ডপে পৌঁছনো—পুরো প্রক্রিয়াটিকেই পুজোর অভিজ্ঞতার অংশ করা হচ্ছে। এরপর মণ্ডপের ভিতরে কাশ্মীরের আবহে দুর্গাপ্রতিমা দর্শন করবেন দর্শনার্থীরা।
ফলে এবারের পুজোয় ‘মণ্ডপে যাওয়া’ এবং ‘প্রতিমা দেখা’—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ থাকছে না। যাত্রাপথই হয়ে উঠছে থিমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বড় পুজোর তালিকায় জায়গা করার লক্ষ্য
বর্ধমান শহরে প্রতি বছর একাধিক বড় বাজেটের দুর্গাপুজো হয়। দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করার জন্য বিভিন্ন পুজো কমিটি নতুন নতুন থিম নিয়ে হাজির হয়। সেই প্রতিযোগিতার মধ্যেই এবার অরবিন্দ পল্লির পরিকল্পনা আলাদা করে নজর কেড়েছে।
উদ্যোক্তাদের আশা, Vande Bharat-এর মতো জনপ্রিয় একটি আধুনিক ট্রেনকে দুর্গাপুজোর থিমের সঙ্গে যুক্ত করার ভাবনা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করবে। তার সঙ্গে কাশ্মীরের পরিবেশ এবং ট্রেনে চেপে মণ্ডপে পৌঁছনোর অভিজ্ঞতা পুজোয় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বিশেষ করে শিশু ও পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের কাছে এই ট্রেনযাত্রা আলাদা আকর্ষণ তৈরি করবে বলেই আশা পুজো কমিটির।
থিমের পিছনে অনুভব ঘোষের ভাবনা
অরবিন্দ পল্লির এবারের থিমের মূল পরিকল্পনা অনুভব ঘোষের। তাঁর ভাবনাতেই Vande Bharat এবং কাশ্মীরকে একসঙ্গে যুক্ত করে গোটা পুজোর পরিকল্পনা তৈরি হয়েছে।
এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এখন মণ্ডপসজ্জার কাজ চলছে। রেললাইন থেকে ট্রেন, স্টেশন থেকে কাশ্মীরের বরফে ঢাকা পরিবেশ—প্রতিটি অংশকে একই থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, পুজো শেষ পর্যন্ত কতটা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, তা নির্ভর করবে এই সমস্ত উপাদান কতটা সফলভাবে একসঙ্গে উপস্থাপন করা যায় তার উপর।
বর্ধমানের পুজোয় নতুন আকর্ষণ
দুর্গাপুজো এখন শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। থিম, শিল্প, আলো এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে দর্শনার্থীদের নতুন অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা প্রতি বছরই দেখা যায়। অরবিন্দ পল্লির এবারের আয়োজনও সেই ধারারই একটি উদাহরণ।
Vande Bharat-এর মতো আধুনিক ভারতীয় রেল পরিষেবার প্রতীককে পুজোর থিমে ব্যবহার করে তার সঙ্গে কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং দুর্গাপ্রতিমাকে যুক্ত করা হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পূর্ণ হলে বর্ধমানের পুজো মানচিত্রে অরবিন্দ পল্লির এই আয়োজন আলাদা করে নজর কাড়তে পারে।
এখন পুজোর দিনগুলিতে দর্শনার্থীরা কতটা উৎসাহ নিয়ে এই ‘ট্রেনযাত্রা’ করেন, সেটাই দেখার। তবে পুজোর আগেই থিমের অভিনবত্ব বর্ধমানের দুর্গাপুজোকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি করেছে।


