ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে ফের কড়া অবস্থান নিল আমেরিকা। ভারতীয় পণ্যের উপর নতুন করে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার থেকে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা। ভারতের পাশাপাশি চিন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ-সহ মোট ৬০টি দেশের উপর এই অতিরিক্ত কর বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে শুরুতে ভারতের উপর যে পরিমাণ শুল্ক চাপানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর নয়াদিল্লির প্রচেষ্টায় প্রস্তাবিত ১২.৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।
মার্কিন প্রতিনিধি জেমিসন গ্রির জানিয়েছেন, আমেরিকার বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারার আওতায় এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। যেসব দেশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে এবং যারা এই বিষয়ে পর্যাপ্ত আইন গ্রহণ করেনি, তাদের লক্ষ্য করেই এই পদক্ষেপ বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রশাসনের তরফে এই প্রস্তাব সামনে আসার পরই ভারতের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। নয়াদিল্লির বক্তব্য ছিল, একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ না করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত। ভারত জানিয়েছিল, বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সেই আলোচনার পরই কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। প্রাথমিক প্রস্তাবে ভারতের পণ্যের উপর ১২.৫ শতাংশ কর চাপানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে এই শুল্ক ভারতের রপ্তানি ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চিন্তা রয়েছে ব্যবসায়ী মহলে।
আমেরিকার নতুন শুল্ক তালিকায় ভারতের পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বের একাধিক বড় অর্থনীতি। চিন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল এবং সুইৎজারল্যান্ডের মতো দেশগুলিকেও এই তালিকায় রাখা হয়েছে। একই অভিযোগে ব্রিটেন, কানাডা, মেক্সিকো এবং তাইওয়ানের উপরও অতিরিক্ত কর বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের দাবি, বিশ্ব বাণিজ্যে শ্রমিক অধিকার এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ধরনের শুল্ক নীতির পিছনে কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চাপ তৈরির বিষয়টিও রয়েছে।
এদিকে ভারতের জন্য আরও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য। জানা যাচ্ছে, রাশিয়া থেকে এখনও যারা তেল ও অন্যান্য শক্তিসম্পদ আমদানি করছে, তাদের উপর বড় অঙ্কের শুল্ক চাপানোর জন্য আমেরিকায় নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ চলছে।
ভারত বর্তমানে রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল ক্রেতা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলির নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারত রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত তেল কিনে আসছে। এই বিষয়টি নিয়ে আগেও আপত্তি জানিয়েছে আমেরিকা।
নতুন আইন কার্যকর হলে ভারতের উপর আলাদা করে বড় ধরনের শুল্ক চাপতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয় পণ্যের উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত কর আরোপের বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
যদিও এখনও পর্যন্ত সেই ধরনের কোনও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের জ্বালানি সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি সম্পর্কের উপর চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক গত কয়েক বছরে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং বিনিয়োগ ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়লেও বাণিজ্য ঘাটতি, শুল্ক এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর ভারতীয় রপ্তানিকারকদের উপর এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে কোন কোন পণ্যের ক্ষেত্রে এই কর প্রযোজ্য হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের আলোচনায় দুই দেশ কী সিদ্ধান্ত নেয় তার উপর।
এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির লক্ষ্য থাকবে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে শুল্কের চাপ আরও কমানো এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করা।



