ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ফের কম্পন
ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস অঞ্চলে যেন বিপর্যয় পিছু ছাড়ছে না। শনিবার সকালে শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিস্তীর্ণ এলাকা কেঁপে ওঠার পর উদ্ধারকাজ যখন পুরোদমে চলছে, তখনই সোমবার ভোরে ফের ভূমিকম্প হয়।
জার্মানির রিসার্চ সেন্টারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবারের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫.৯। ফ্লোরেস অঞ্চলেই কম্পনের কেন্দ্রস্থল বলে প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে। পরপর ভূমিকম্পের ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
শনিবারের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল আরও বেশি—৭.৭। তার জেরে ফ্লোরেস প্রদেশের ছয়টি এলাকা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বহু বাড়ি ভেঙে পড়ে, বিভিন্ন জায়গায় ভূমিধস নামে এবং একাধিক গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
উদ্ধারকারী দলগুলি ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছে। তার মধ্যেই নতুন করে ভূমিকম্প হওয়ায় উদ্ধারকাজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৩
শনিবারের ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই বেড়ে হয়েছে ৫৩। রবিবার রাত পর্যন্ত উদ্ধারকারী দলগুলি আরও ছয়টি দেহ উদ্ধার করেছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য এখন ধ্বংসস্তূপের নীচে আর কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খুঁজে বের করা। ফ্লোরেসের ছয়টি ক্ষতিগ্রস্ত জেলায় উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে। বিশেষ নজরে রয়েছে মাঙ্গারাই, পূর্ব মাঙ্গারাই এবং নাগেকিওয়ে।
এই এলাকাগুলিতে ভূমিকম্পের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। একাধিক বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। কোথাও কোথাও রাস্তার উপর ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় উদ্ধারকারী দলগুলির যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাড়িঘর হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে হাজার হাজার মানুষ
ভূমিকম্পের পরে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের পুনর্বাসন। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। কেউ কেউ আবার নিরাপত্তার কারণে বাড়িতে ফিরতে পারছেন না।
পূর্ব নুসা টেঙ্গারা এলাকায় ৯০০-রও বেশি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। আরও প্রায় ৪৫০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৫,০০০ মানুষকে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হয়েছে।
শুধু ফ্লোরেস অঞ্চলেই অন্তত ২৪১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রত্যন্ত এলাকাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় সব জায়গার তথ্য এখনও প্রশাসনের হাতে এসে পৌঁছয়নি।
ভূমিধস সরিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধসও পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। পাহাড়ি রাস্তার উপর মাটি ও পাথর নেমে আসায় একাধিক গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
মাউমেরে-তে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলের প্রধান ফাতুর রহমান জানিয়েছেন, উদ্ধারকারীরা বেশিরভাগ ভূমিধস সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে আগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া কয়েকটি গ্রামের সঙ্গে ফের সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।
তবে সমস্যা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন থাকায় উদ্ধার ও অনুসন্ধানের কাজে সমস্যা হচ্ছে। অনেক এলাকায় মোবাইল যোগাযোগও ব্যাহত হওয়ায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পর্কে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
উদ্ধারকারীদের সামনে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হল সময়। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত অবস্থায় আটকে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব তাঁদের কাছে পৌঁছনো জরুরি। সেই কারণে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে নজর
প্রশাসন জানিয়েছে, ফ্লোরেসের ছয়টি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। তবে মাঙ্গারাই, পূর্ব মাঙ্গারাই এবং নাগেকিওয়ের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভাবে বেশি উদ্বেগজনক।
এই এলাকাগুলিতে বাড়িঘর ভেঙে পড়ার পাশাপাশি ভূমিধস এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দুর্গম এলাকাগুলিতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছতেও সময় লাগছে।
শনিবারের ভূমিকম্পের পর পরবর্তী কম্পনের আশঙ্কায় স্থানীয়দের অনেকেই বাড়িতে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন। সোমবার ফের ৫.৯ মাত্রার ভূমিকম্প সেই আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রশাসনের তরফে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নিরাপদ জায়গায় থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে খাবার, পানীয় জল এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজও চলছে।
বিপর্যয়ের মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা
পরপর কম্পন এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে ইন্দোনেশিয়ার উদ্ধার অভিযানে একাধিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রাণহানি ও বাড়িঘর ধ্বংসের যে হিসাব সামনে এসেছে, তা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে যেসব এলাকায় এখনও উদ্ধারকারী দল পৌঁছতে পারেনি, সেখান থেকে নতুন করে হতাহতের খবর আসতে পারে। ধ্বংসস্তূপের নীচে নিখোঁজদের সন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামোর হিসাব তৈরিই এখন প্রশাসনের প্রধান কাজ।
শনিবারের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর যখন ফ্লোরেস ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখন সোমবারের নতুন কম্পন পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। আপাতত উদ্ধারকাজ, আহতদের চিকিৎসা এবং ঘরহারা মানুষদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়াই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।



