মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কড়া অবস্থানের পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার রাতে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একাধিক বিস্ফোরণের খবর সামনে আসে। হামলার পরপরই মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) অভিযানের দায় স্বীকার করে জানায়, আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করার অভিযোগে ইরানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই অভিযান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তা রক্ষার অংশ।
ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে বুশেহর, বন্দর আব্বাস, চাবাহার, কোনারাক, সিরিক এবং ইরানশাহর। এর মধ্যে বুশেহর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখানে ইরানের একমাত্র কার্যকর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবস্থিত। যদিও ওই স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সরকারিভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানশাহরের একটি সামরিক বিমানঘাঁটিও হামলার আওতায় এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের দাবি, ওই ঘাঁটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলির অন্যতম। তবে ইরান এখনও পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি।
হামলার কিছুক্ষণের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে একাধিক ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্তিশালী ও সফল অভিযান পরিচালনা করেছে। তাঁর বক্তব্য, এই হামলা আগের যেকোনও সামরিক পদক্ষেপের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতার উপর বড় প্রভাব ফেলবে।
এই অভিযানের পর গোটা মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। উপসাগরীয় একাধিক দেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে বাহরিন, কুয়েত এবং আশপাশের কয়েকটি দেশে সাইরেন বাজিয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। বাহরিনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক নাগরিকদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রশাসনকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল এই সমুদ্রপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন হামলার পর ইরানও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইরানি পার্লামেন্টের বিদেশনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই বলেন, দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই দেশের জনগণকে ভয় না পেয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ইরান এই হামলার জবাব দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তার ফল ভোগ করতে হবে।
রেজাইয়ের বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, তেহরান এই ঘটনাকে শুধু একটি সামরিক অভিযান হিসেবে দেখছে না, বরং দেশের সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে ভবিষ্যতে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের আশঙ্কা।
এই হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় জলপথে উত্তেজনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এই সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। কূটনৈতিক মহলে উদ্বেগ, সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে তা শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; গোটা পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। কারণ সামরিক সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মানবিক ও অর্থনৈতিক— দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমানে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন বাহিনীও উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আরও বাড়িয়েছে। দুই পক্ষের কড়া অবস্থানের মধ্যে আগামী কয়েকদিন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।



