লেবাননে রাতভর বোমাবর্ষণ, স্থগিত ওয়াশিংটন-তেহরান আলোচনা
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা বাস্তবে রূপ নেওয়ার আগেই নতুন করে উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে সুইৎজারল্যান্ডে যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ মুহূর্তে স্থগিত করে দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আপাতত তাঁর সুইৎজারল্যান্ড সফরের কোনও পরিকল্পনা নেই। পরে সুবিধাজনক সময়ে আলোচনার নতুন দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হবে।
কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে লেবাননের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালায় ইজরায়েল। সেই অভিযানে একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর সামনে আসে। হামলার কথা ইজরায়েল নিজেও স্বীকার করেছে।
ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হেজবোল্লার ধারাবাহিক হামলার জবাব হিসেবেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাদের অভিযোগ, উত্তর ইজরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে হেজবোল্লা। সাম্প্রতিক হামলায় কয়েকজন ইজরায়েলি সেনার মৃত্যুর কথাও দাবি করেছে তারা। সেই কারণেই দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার ইঙ্গিত দিয়েছে তেল আভিভ।
এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে সদ্য শুরু হওয়া শান্তি প্রক্রিয়ার উপর বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘ সংঘাতের পর চলতি সপ্তাহেই ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক বা মউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল, লেবানন-সহ বৃহত্তর অঞ্চলে নতুন করে সামরিক সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা এবং উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শান্তি আলোচনার জন্য পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আলোচনার ঠিক আগেই লেবাননে নতুন হামলা সেই আস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এর ফলে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে শুরু হওয়া সংলাপের গতি থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে আবার আলোচনায় বসার চেষ্টা করা হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈঠক আয়োজন করা উপযুক্ত নয় বলেই ওয়াশিংটনের অভিমত।
এদিকে ইরান এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্থগিত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করলেও তেহরানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলি জানাচ্ছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন করতে হবে। লেবাননে সামরিক অভিযান চলতে থাকলে কোনও শান্তি উদ্যোগ সফল করা কঠিন হবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন একটি কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা, অন্যদিকে ইজরায়েলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ— দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করাই ওয়াশিংটনের বড় চ্যালেঞ্জ।
এ প্রসঙ্গে ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রশাসন বারবার মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও, ইজরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ সেই প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে লেবানন ইস্যুতে দুই মিত্র দেশের মধ্যে কৌশলগত মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়েও জল্পনা বাড়ছে।
উল্লেখ্য, ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল, তার লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতি নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমিয়ে নতুন সংঘর্ষের সম্ভাবনা রোধ করা। আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক সংযম এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি তৈরি করা।
কিন্তু দক্ষিণ লেবাননে নতুন হামলা সেই প্রচেষ্টাকে কার্যত ধাক্কা দিয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে, আলোচনার নতুন দিনক্ষণ ঘোষণা হলেও আদৌ কি আগের মতো ইতিবাচক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে?
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনীতিতে কোনও শান্তি উদ্যোগ সফল করতে গেলে সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষের সমান আগ্রহ এবং সংযম প্রয়োজন। লেবাননের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিল, সামরিক উত্তেজনা মুহূর্তের মধ্যে কূটনৈতিক অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিতে পারে। ফলে ইরান-আমেরিকা সংলাপের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনে লেবানন ও ইজরায়েল সীমান্তের পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তার উপর।



