পশ্চিম এশিয়ার উত্তপ্ত পরিস্থিতির অবসানে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। বহুদিনের অচলাবস্থার পর অবশেষে শান্তিচুক্তিতে সম্মতি জানাল ইরান ও আমেরিকা। দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের অনুমোদনের মাধ্যমে কার্যকর হওয়া এই সমঝোতা শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ডিজিটাল পদ্ধতিতে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। যদিও এর আগে আগামী ১৯ জুন সুইৎজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগেই ডিজিটাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে সমঝোতা কার্যকর হওয়ায় জেনেভার কর্মসূচি নিয়ে নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে।
এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষই সুইৎজারল্যান্ডের অনুষ্ঠান বাতিলের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ডিজিটাল অনুমোদন কার্যত শান্তিচুক্তিকে কার্যকর করে ফেলেছে। ফলে পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান হয়তো আর প্রয়োজন হবে না।
এক মার্কিন সংবাদমাধ্যমের দাবি, জি৭ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠকের ফাঁকেই ট্রাম্প এই সমঝোতা অনুমোদন করেন। অন্যদিকে, ইরানের বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান যে খসড়া প্রস্তাব দুই দেশের কাছে পাঠিয়েছিল, তাতেই উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে সম্মতি জানিয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই সমঝোতার ফলে ফের খুলতে চলেছে হরমুজ প্রণালী। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই সামুদ্রিক পথের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবহণ করা হয়। সে কারণেই হরমুজকে বিশ্ব অর্থনীতির ‘তৈল ধমনী’ বলা হয়।
সংঘাত শুরুর পর হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়, বিভিন্ন দেশে জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং বিশ্ব অর্থনীতির গতি মন্থর হতে শুরু করে। ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশও এই পরিস্থিতির প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়া এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ পুনরায় চালু হওয়া বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর চাপও অনেকটাই কমতে পারে।
জানা গিয়েছে, শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে একাধিক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে দুই দেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়ানোর প্রতিশ্রুতি। ইরান, লেবানন এবং পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে খবর।
এছাড়া ইজরায়েল ও আমেরিকার তরফে নতুন করে কোনও সামরিক অভিযান শুরু না করার বিষয়ে নিশ্চয়তা দেওয়ার কথাও উঠে এসেছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অবরোধ এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ব্যাপারেও ঐকমত্য হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে জারি থাকা কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইরানের জাহাজ চলাচলের উপর আরোপিত বিধিনিষেধও পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে সূত্রের দাবি।
এছাড়া ইরানের বাজেয়াপ্ত আর্থিক সম্পদের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা হয়নি, তবুও কূটনৈতিক মহল এটিকে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। সমঝোতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ইরানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বিদেশি সেনা উপস্থিতি কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও দুই দেশ সমঝোতার পথে এগিয়েছে।
খবর অনুযায়ী, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে নীতিগত আশ্বাস দিয়েছে। যদিও ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি শুধু ইরান-আমেরিকা সম্পর্কেই নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে না, বরং গোটা পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতা ফেরানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসে আবদ্ধ এই অঞ্চলে কূটনৈতিক সমঝোতার এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি বড় মোড় বলেই মনে করা হচ্ছে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও সামনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ। সমঝোতার শর্তগুলি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, আঞ্চলিক শক্তিগুলির প্রতিক্রিয়া কী হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এই শান্তি কতটা স্থায়ী হবে, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।



