বিশ্ব চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে যাঁদের অবদান যুগান্তকারী বলে স্বীকৃত, তাঁদের মধ্যে অন্যতম আচার্য সুশ্রুত। এবার তাঁরই স্মৃতিতে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ শহরে এক বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করা হল। বিশ্বের প্রাচীনতম সার্জিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির একটি ‘রয়্যাল কলেজ অফ সার্জনস’-এর প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছে সুশ্রুতের ব্রোঞ্জ মূর্তি। চিকিৎসা ইতিহাসবিদদের মতে, এই ঘটনা শুধু ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের চিকিৎসা ঐতিহ্যের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
সুশ্রুতকে দীর্ঘদিন ধরেই আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারির পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর লেখা ‘সুশ্রুত সংহিতা’ প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অসামান্য দলিল, যেখানে অস্ত্রোপচার, প্লাস্টিক সার্জারি, হাড় জোড়া, ক্ষত চিকিৎসা এবং বিভিন্ন শল্যচিকিৎসার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ষষ্ঠ শতকে তিনি জীবিত ছিলেন এবং তাঁর কাজ পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে চিকিৎসাশাস্ত্রের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
এডিনবার্গে স্থাপিত এই মূর্তির পেছনে মূল উদ্যোগ নিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সার্জন অধ্যাপক চন্দ্র চেরুভু। তাঁর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলেই এই আন্তর্জাতিক স্তরের স্বীকৃতি সম্ভব হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রায় ৯০ কেজি ওজনের এই ব্রোঞ্জ মূর্তিটি তৈরি করেছেন তামিলনাড়ুর একদল ভাস্কর, যাঁরা প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যকে আধুনিক শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার কাজ করেছেন।
অনুষ্ঠানে চিকিৎসা মহলের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সুশ্রুতের অবদানকে শুধু ঐতিহাসিক নয়, বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারির বহু মৌলিক ধারণার উৎস খুঁজে পাওয়া যায় সুশ্রুতের লেখায়।
ভারতের চিকিৎসা ঐতিহ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ রয়েছে। আয়ুর্বেদ থেকে শুরু করে প্রাচীন শল্যচিকিৎসা—ভারতীয় জ্ঞানভাণ্ডারের বহু দিকই এখন গবেষণার বিষয়। এডিনবার্গে সুশ্রুতের মূর্তি স্থাপন সেই আগ্রহকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতীয় দূতাবাসও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। স্কটল্যান্ডে ভারতীয় হাইকমিশন তাদের এক্স (পূর্বতন টুইটার) হ্যান্ডলে জানায়, এই উদ্যোগ ভারত ও স্কটল্যান্ডের চিকিৎসা ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করল। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সার্জারি শিক্ষার প্রসারে ‘রয়্যাল কলেজ’ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তাও স্বীকৃত হয়েছে এই ঘটনার মাধ্যমে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভবিষ্যতে ভারতের প্রাচীন বিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণাকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার পথ খুলে দেবে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সুশ্রুত ও তাঁর কাজ সম্পর্কে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, ইতিহাসবিদদের বক্তব্য, সুশ্রুত শুধু একজন চিকিৎসক নন, তিনি ছিলেন এক যুগান্তকারী চিন্তাবিদ। অস্ত্রোপচারকে একটি পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।
এডিনবার্গের মতো ঐতিহাসিক শহরে তাঁর মূর্তি স্থাপন তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সম্মান নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতির প্রতীক। ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই গৌরবময় অধ্যায় ভবিষ্যতেও বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।



