ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলির মধ্যে অন্যতম সিন্ধু নদী ও তার জলবণ্টন চুক্তি। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তি কয়েক দশক ধরে দুই দেশের মধ্যে জলবণ্টনের একটি কাঠামো তৈরি করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীর ও সীমান্ত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে এই চুক্তি আবারও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
গত বছর জম্মু ও কাশ্মীরের বৈসরণ উপত্যকায় জঙ্গি হামলার পর ভারত সরকারের অবস্থান বদলায়। নয়াদিল্লি স্পষ্টভাবে জানায়, সন্ত্রাসবাদ ও আলোচনাকে একসঙ্গে চালানো সম্ভব নয়—“রক্ত আর জল একসঙ্গে বইতে পারে না” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারত কার্যত কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। এরপরই সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি আংশিকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়।
এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ইসলামাবাদ একাধিকবার অভিযোগ করে যে, ভারত আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করছে এবং পাকিস্তানের জলনির্ভর কৃষি অর্থনীতিকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তবে ভারত এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে, সন্ত্রাসবাদের প্রেক্ষিতে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী Khawaja Asif এক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নতুন করে বিতর্ক উসকে দেন। তিনি দাবি করেন, যদি সিন্ধু জলবণ্টন নিয়ে ভারতের কোনও পদক্ষেপ পাকিস্তানের জন্য “সংকটজনক পরিস্থিতি” তৈরি করে, তাহলে ইসলামাবাদ সামরিক বিকল্পও বিবেচনা করতে পারে।
তাঁর কথায়, জল পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম মূল ভিত্তি। সেই কারণে ভারতের কোনও সিদ্ধান্ত যদি সরাসরি পাকিস্তানের জলপ্রবাহে প্রভাব ফেলে, তাহলে দেশটি কূটনৈতিক সীমারেখার বাইরে গিয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দিতে বাধ্য হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। এই মন্তব্য কার্যত দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানি মন্ত্রী আরও দাবি করেন, সিন্ধু জলচুক্তি আংশিকভাবে স্থগিত হওয়ার পর থেকেই তাদের দেশে জলসংকট তৈরি হয়েছে। যদিও ভারতের দাবি, চুক্তির শর্ত মেনেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করা হয়নি।
এদিকে ভারতের প্রশাসনিক মহলের একাংশের বক্তব্য, সীমান্তে সন্ত্রাসবাদ অব্যাহত থাকলে পুরনো কূটনৈতিক কাঠামো একইভাবে বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। সেই কারণেই জলনীতি ও নিরাপত্তা নীতিকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ভারতের জলশক্তি মন্ত্রী সি আর পাটিলের একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসে, যেখানে তিনি ইঙ্গিত দেন যে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের দিকে সিন্ধু নদের জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হতে পারে। এই বক্তব্য ঘিরে পাকিস্তানে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয় এবং তারই প্রতিক্রিয়ায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর কড়া মন্তব্য সামনে আসে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত এক বছরে দুই দেশের সম্পর্ক একাধিকবার উত্তপ্ত হয়েছে। সীমান্ত সংঘর্ষ, কূটনৈতিক বার্তা বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়েছে। জলচুক্তি ইস্যু সেই উত্তেজনার নতুন কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, জলচুক্তি নিয়ে এই ধরনের কড়া মন্তব্য দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার পথ আরও সংকুচিত করতে পারে। কারণ, জল শুধু রাজনৈতিক নয়, কৃষি ও জনজীবনের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ফলে বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর।
ভারতের পক্ষ থেকে যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কোনো সামরিক প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি। বরং নয়াদিল্লির অবস্থান, যেকোনো সিদ্ধান্তই আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তার প্রেক্ষিতে নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে চাপ দিচ্ছে ভারতের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে। ফলে জলচুক্তি এখন শুধু দুই দেশের সম্পর্কের ইস্যু নয়, বরং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে।
সব মিলিয়ে সিন্ধু জলচুক্তি ঘিরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর যুদ্ধ-ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।



