মধ্যপ্রাচ্যে টানা সাড়ে তিন মাস ধরে চলা সংঘাত, পাল্টা সামরিক তৎপরতা এবং হরমুজ প্রণালী ঘিরে অচলাবস্থার জেরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছিল তীব্র উদ্বেগ। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি অপরিশোধিত তেল যে সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়, সেই হরমুজ কার্যত বন্ধ থাকায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তায় পড়েছিল বহু দেশ। এই পরিস্থিতিতেই নতুন আশার আলো দেখালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নিজের সোশাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক শান্তি সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে। আগামী শুক্রবার, অর্থাৎ ১৯ জুন, সুইৎজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেই চুক্তি কার্যকর হলেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পুনরায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল শুরু হবে।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর প্রশাসন এমন একটি চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছে যা শুধু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাবে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে। তিনি দাবি করেন, তাঁর পূর্বসূরিরা বহুবার ইরানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করলেও স্থায়ী শান্তির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারেননি।
জানা যাচ্ছে, এই চুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে কাতার। সূত্রের খবর, কাতারের প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই তেহরানে পৌঁছে চূড়ান্ত আলোচনার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, দুই দেশ বেশ কয়েকটি মূল বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল হরমুজ প্রণালীর পূর্ণ পুনরায় উন্মুক্তকরণ। এর ফলে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত এই কৌশলগত সামুদ্রিক পথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেলবাহী জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হবে। একইসঙ্গে মার্কিন বাহিনীর অবরোধমূলক অবস্থানও প্রত্যাহার করা হবে বলে জানা যাচ্ছে।
শুধু তাই নয়, খসড়া চুক্তিতে ইরানের উপর আরোপিত একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়ও রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ফের তেল রপ্তানির সুযোগ পেতে পারে তেহরান। এতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং তেলের দাম স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সূত্রের দাবি, চুক্তির আওতায় ইরানের বাজেয়াপ্ত প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হয়েছে। ইরানকে প্রতিশ্রুতি দিতে হতে পারে যে তারা ভবিষ্যতে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটবে না এবং উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালাবে না।
তবে এর বিনিময়ে শান্তিপূর্ণ ও অসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে পারে আমেরিকা। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-র তত্ত্বাবধানে অসামরিক পরমাণু প্রকল্পে সহযোগিতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে খবর।
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। কূটনৈতিক মহলের দাবি, খসড়ায় এমন কিছু শর্ত রাখা হয়েছে যাতে ইরান ভবিষ্যতে বিদেশে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থাকে। একইসঙ্গে দুই দেশ বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি নিয়েও আলোচনা করতে পারে।
এই সম্ভাব্য সমঝোতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলির উপর। ভারতের মতো দেশ, যাদের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল হরমুজ হয়ে আসে, তাদের কাছে এই ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হরমুজ খুলে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে, পরিবহণ ব্যয় কমবে এবং জ্বালানির দামে চাপ কিছুটা হলেও কমতে পারে।
তবে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এখনও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। কারণ ট্রাম্পের দাবি সামনে এলেও ওয়াশিংটন এবং তেহরান— দুই দেশই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করেনি। পাশাপাশি সৌদি আরব, ইজরায়েলের মতো মার্কিন মিত্র দেশগুলির অবস্থানও এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, যদি নির্ধারিত দিনে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং হরমুজ প্রণালী সত্যিই খুলে যায়, তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।



