স্বাধীন স্লোভাকিয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক সফর
ভারত-স্লোভাকিয়া কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল সোমবার। ইউরোপ সফরের দ্বিতীয় পর্বে ব্রাতিস্লাভায় পৌঁছে ইতিহাস গড়লেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কারণ, ১৯৯৩ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিভাজনের মাধ্যমে স্বাধীন স্লোভাকিয়া রাষ্ট্রের জন্মের পর এই প্রথম কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী দেশটিতে সরকারি সফরে গেলেন।
রাজধানী ব্রাতিস্লাভার বিমানবন্দরে মোদিকে স্বাগত জানান স্লোভাকিয়ার বিদেশমন্ত্রী জুরাজ ব্লানার। কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরে তাঁকে রুটি ও লবণ দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বহু দেশে রুটি ও লবণ দিয়ে অতিথিকে বরণ করার প্রথা সম্মান, সৌহার্দ্য এবং সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করাই মূল লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ভারত ও স্লোভাকিয়ার মধ্যে বহুমাত্রিক সহযোগিতা আরও গভীর করা। নয়াদিল্লির মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মধ্য ইউরোপের দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্লোভাকিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের অটোমোবাইল শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি রেল প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত প্রকৌশল ক্ষেত্রেও দেশটির বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। ভারতও এই ক্ষেত্রগুলিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের ওপর জোর দিচ্ছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে শিল্প, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
দু’দিনের সফরে স্লোভাকিয়ার প্রেসিডেন্ট পিটার পেলেগ্রিনি এবং প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকোর সঙ্গে পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন নরেন্দ্র মোদি। সূত্রের খবর, এই বৈঠকগুলিতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিময় কর্মসূচি এবং ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় শিল্পের প্রবেশাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এছাড়াও স্লোভাকিয়ার একাধিক শীর্ষ শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ভারত বর্তমানে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন এবং সবুজ জ্বালানির মতো ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। সেই প্রেক্ষিতে এই বৈঠকগুলি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সফর নিয়ে আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী
স্লোভাকিয়ায় পৌঁছনোর পর সামাজিক মাধ্যমে একটি বার্তা পোস্ট করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি জানান, এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার সুযোগ তৈরি করবে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন পথ খুলে দেবে। একই সঙ্গে স্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার জন্য তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন।
কূটনৈতিক মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রী মোদির এই বার্তা শুধু সৌজন্য নয়, বরং মধ্য ইউরোপের দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কৌশলগত ইঙ্গিতও বহন করছে।
গত কয়েক বছরে বেড়েছে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ
ভারত এবং স্লোভাকিয়ার মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু স্লোভাকিয়া সফর করেছিলেন। অন্যদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসেছিলেন স্লোভাকিয়ার প্রেসিডেন্ট পিটার পেলেগ্রিনি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত এই উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগই প্রধানমন্ত্রীর সফরের ভিত তৈরি করেছে। ফলে এবারের বৈঠকগুলি শুধুমাত্র কূটনৈতিক সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং একাধিক বাস্তবমুখী সহযোগিতার পথও তৈরি করতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন মাত্রা
স্লোভাকিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় এই সফরকে আরও বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখছে নয়াদিল্লি। ভারতের লক্ষ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং কৌশলগত সম্পর্ক আরও মজবুত করা। সেই লক্ষ্য পূরণে স্লোভাকিয়ার মতো মধ্য ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার আবহে ইউরোপের সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্লোভাকিয়া থেকে ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে
স্লোভাকিয়া সফর শেষ করে আগামী ১৬ ও ১৭ জুন ফ্রান্সের এভিয়ান শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যদিও ভারত জি-৭-এর স্থায়ী সদস্য নয়, তবুও বিশেষ আমন্ত্রিত দেশ হিসেবে গত কয়েক বছর ধরেই এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আমন্ত্রণে এবারের সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন মোদি। সেখানে বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের মতো বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। জি-৭ সম্মেলনের পর প্যারিসে একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দেশে ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী।



