রেজিস্ট্রেশন নম্বর রয়েছে, নেই চিকিৎসাবিদ্যার যোগ্যতা!
চিকিৎসকের পরিচয়পত্রে MBBS, MD-এর মতো ডিগ্রি। সরকারি নথিতে রয়েছে রেজিস্ট্রেশন নম্বর। রোগীও হয়তো জানেন না, তাঁর সামনে বসা ব্যক্তি আদৌ মেডিক্যাল কলেজে পড়েছেন কি না।
পশ্চিমবঙ্গে এমনই এক ভয়াবহ অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, কয়েকশো ব্যক্তি ভুয়ো মেডিক্যাল ডিগ্রি ব্যবহার করে চিকিৎসক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আরও গুরুতর অভিযোগ হল, তাঁদের কয়েকজন ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষাতেই বসেননি। অথচ পরবর্তীতে ভিনরাজ্যের মেডিক্যাল কলেজের নামে তৈরি নথি দেখিয়ে চিকিৎসক হিসেবে রেজিস্ট্রেশন সংগ্রহ করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাস্থ্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রায় ৫০০ ভুয়ো চিকিৎসকের সন্দেহ
অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিং হোমের সম্পাদক ডা. রাজীব পাণ্ডে এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাঁর সন্দেহ, রাজ্যজুড়ে এমন ভুয়ো চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ৫০০ হতে পারে। যদিও এই সংখ্যা এখনও সরকারি তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
সংগঠনের অভিযোগ, একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে জাল মেডিক্যাল ডিগ্রি তৈরি করে তা ব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছে। সেই নথির ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
অর্থাৎ শুধু জাল ডিগ্রি তৈরিই নয়, সেই ডিগ্রিকে সরকারি রেজিস্ট্রেশনের আওতায় নিয়ে আসার জন্যও একটি সংগঠিত ব্যবস্থা কাজ করেছে কি না, এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
প্রতি প্রার্থীর কাছ থেকে ১০ লক্ষ?
এই অভিযোগের আর্থিক দিকটিও যথেষ্ট চাঞ্চল্যকর।
ডা. রাজীব পাণ্ডের দাবি, সংশ্লিষ্ট চক্রটি একজন প্রার্থীর কাছ থেকে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকতে পারে। সেই অর্থের বিনিময়ে ভুয়ো নথি তৈরি থেকে শুরু করে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠন।
তবে এই অর্থের অঙ্ক এবং লেনদেনের বিষয়ে এখনও সরকারি তদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসেনি।
যদি অভিযোগ সত্যি হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু ভুয়ো চিকিৎসকের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে আর্থিক দুর্নীতি, জাল নথি তৈরি এবং সরকারি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার অপব্যবহারের অভিযোগও যুক্ত হতে পারে।
স্বাস্থ্যদপ্তরে তদন্তের দাবি
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চেয়ে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে চিঠি দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিং হোম।
সংগঠনের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে এই চক্রের প্রকৃত পরিধি সামনে আসবে না। শুধু কয়েকজন ভুয়ো চিকিৎসককে চিহ্নিত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, তাঁদের রেজিস্ট্রেশন কীভাবে তৈরি হল এবং সেই প্রক্রিয়ায় কারা সাহায্য করেছিল, সেটিও খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
ডা. রাজীব পাণ্ডে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরানোর দাবিও জানিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, তদন্তকে প্রভাবমুক্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট পদাধিকারীদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা প্রয়োজন।
এই দাবির বিষয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমেই সামনে এল দুই নাম
তদন্তের দাবি ওঠার মধ্যেই অন্তত দু’জন চিকিৎসকের যোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ডা. জুলফিকার মণ্ডল। তাঁর নামে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের ৮৯০২১ নম্বর রেজিস্ট্রেশন রয়েছে বলে অভিযোগকারী সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে।
জুলফিকারের নিউটাউনের ডিডি ব্লকে একটি নার্সিংহোম রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি বারাসাতের বামুনপাড়ায় সম্রাজ্ঞী নার্সিংহোমের সঙ্গেও তাঁর নাম যুক্ত।
সেখানে তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে MBBS, DGO এবং MD-এর মতো ডিগ্রি উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু তাঁর MBBS ডিগ্রির উৎস নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে।
বিহারের মেডিক্যাল কলেজের দাবিও প্রশ্নের মুখে
জুলফিকার মণ্ডল বিহারের শ্রীকৃষ্ণ মেডিক্যাল কলেজ থেকে MBBS পাশ করেছেন বলে দাবি করেছিলেন বলে জানা যাচ্ছে।
কিন্তু অভিযোগ, বিহারের সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষের তরফে সেই দাবির কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ তিনি যে প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসাবিদ্যা পড়েছেন বলে দাবি করেছেন, সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার সমর্থনে প্রয়োজনীয় তথ্য না মেলার অভিযোগ উঠেছে।
এই ধরনের তথ্য সামনে আসার পর তাঁর পশ্চিমবঙ্গের মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন কীভাবে হয়েছিল, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা এখনও বলা যায় না।
শিশুর মৃত্যুর তদন্তে উঠে এল আরও এক চিকিৎসকের নাম
অন্যদিকে, পূর্ব বর্ধমানে একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনার তদন্ত করতে গিয়েও ভুয়ো চিকিৎসকের অভিযোগ সামনে আসে।
অভিযোগ, ফাইমোসিসের একটি অস্ত্রোপচারের পর শিশুটির মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনার তদন্তের সূত্র ধরে ডা. শেখ সাইদুর হকের নাম সামনে আসে।
তদন্তে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর নামে থাকা একাধিক মেডিক্যাল ডিগ্রির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে অসঙ্গতি পাওয়া যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, তিনি পূর্ব বর্ধমানের একাধিক বেসরকারি নার্সিংহোমে সার্জন হিসেবে কাজ করছিলেন বলে অভিযোগ।
যদি কোনও ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে MBBS পাশ না করেও চিকিৎসক বা সার্জন হিসেবে কাজ করে থাকেন, তাহলে রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
স্বাস্থ্যসাথী থেকে আয়ুষ্মান—অভিযোগ আরও গুরুতর
ভুয়ো চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু রোগী দেখানো বা জাল ডিগ্রি ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
ডা. রাজীব পাণ্ডের অভিযোগ, আগের সরকারের আমলে এমন চিকিৎসকদের একাংশ ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে বেআইনিভাবে অর্থ উপার্জন করে থাকতে পারেন।
এবার কেন্দ্রীয় ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প চালু হওয়ার পরও একই ধরনের কারচুপির চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তাঁর অভিযোগ।
তবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে সরকারি তদন্ত প্রয়োজন। কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
কীভাবে মিলল রেজিস্ট্রেশন?
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটাই—যাঁরা আদৌ চিকিৎসাবিদ্যা পড়েননি বা ডাক্তারির প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেননি বলে অভিযোগ, তাঁরা কীভাবে মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন পেলেন?
সাধারণভাবে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার জন্য স্বীকৃত মেডিক্যাল শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন। সেই ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে কেউ যদি ভুয়ো নথির মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন পেয়ে থাকেন, তাহলে রেজিস্ট্রেশন যাচাইয়ের গোটা প্রক্রিয়াই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তাই তদন্তে শুধু অভিযুক্ত চিকিৎসকদের নথি পরীক্ষা করলেই হবে না। তাঁদের আবেদনপত্র, ডিগ্রি, সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কলেজের রেকর্ড এবং রেজিস্ট্রেশনের সময় জমা দেওয়া নথিও যাচাই করা প্রয়োজন।
রোগীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
এই অভিযোগের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হল রোগীদের নিরাপত্তা।
একজন প্রকৃত চিকিৎসক দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ, মেডিক্যাল শিক্ষা এবং ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার যোগ্যতা অর্জন করেন। সেখানে কোনও ব্যক্তি যদি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়াই চিকিৎসার দায়িত্ব নেন, তাহলে ভুল রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে ভুল ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের মতো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে নার্সিংহোম বা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়োগের সময় তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং রেজিস্ট্রেশন কতটা যাচাই করা হয়, সেই প্রশ্নও এবার সামনে আসছে।
তদন্ত হলে কোন কোন বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার?
এই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথমত, সন্দেহভাজন চিকিৎসকদের মেডিক্যাল ডিগ্রি সত্যি কি না। দ্বিতীয়ত, তাঁরা সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কলেজে আদৌ পড়াশোনা করেছেন কি না। তৃতীয়ত, তাঁদের নাম কোনও প্রবেশিকা পরীক্ষা বা মেডিক্যাল শিক্ষার সরকারি রেকর্ডে রয়েছে কি না।
এর পাশাপাশি রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার সময় জমা দেওয়া নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রক্রিয়াও পরীক্ষা করতে হবে।
যদি কোনও চক্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, তাহলে তার আর্থিক লেনদেন, মধ্যস্থতাকারী এবং জাল নথি তৈরির উৎসও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
সামনে আরও বড় তালিকা?
এখনও পর্যন্ত দু’জনের নাম সামনে এলেও অভিযোগের পরিধি অনেক বড় বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রায় ৫০০ জনের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
তাই স্বাস্থ্যদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি পূর্ণাঙ্গ যাচাই শুরু করে, তাহলে আরও নাম সামনে আসতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একইসঙ্গে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে, তাঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই পৃথকভাবে শিক্ষাগত নথি যাচাই করা জরুরি। কারণ অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে ভুয়ো চিকিৎসক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে বড় পরীক্ষা
চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত। তাই এই অভিযোগকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
যদি সত্যিই ভুয়ো ডিগ্রি ব্যবহার করে বহু ব্যক্তি চিকিৎসক হিসেবে রেজিস্ট্রেশন পেয়ে থাকেন, তাহলে কীভাবে এতদিন সেই জালিয়াতি নজর এড়াল, সেটিও তদন্তের বিষয় হওয়া উচিত।
অন্যদিকে, অভিযোগের প্রতিটি তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করাও সমান জরুরি। প্রকৃত সত্য সামনে এলেই বোঝা যাবে সমস্যাটি কতটা বিস্তৃত এবং এর পিছনে কারা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, রাজ্যজুড়ে কয়েকশো ভুয়ো চিকিৎসকের সম্ভাব্য অস্তিত্বের অভিযোগ স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। রেজিস্ট্রেশন নম্বর, জাল ডিগ্রি, কোটি টাকার সম্ভাব্য লেনদেন এবং বেসরকারি হাসপাতাল-নার্সিংহোমে চিকিৎসা করার অভিযোগ—সবকিছুরই নিরপেক্ষ তদন্ত এখন জরুরি। তদন্তে সত্যিই কোনও বড় চক্রের সন্ধান মেলে কি না, নাকি অভিযোগের পরিধি শেষ পর্যন্ত অনেক ছোট হয়, এখন সেদিকেই নজর।



