প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রিতে কড়া নজর
অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করতে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রেও নিয়ম মানার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। Drugs and Cosmetics Rules, 1945-এর অধীনে Schedule H এবং Schedule H1-এর ওষুধের ক্ষেত্রে Registered Medical Practitioner-এর প্রেসক্রিপশন ছাড়া খুচরো বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। Schedule H1 ওষুধের লেবেলেও প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি না করার সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক।
নতুন করে এই নিয়মের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হল, রোগীর নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়ার প্রবণতা কমানো। বিশেষ করে জ্বর, গলা ব্যথা, সর্দি বা কাশির মতো সাধারণ উপসর্গ হলেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দেওয়া নিয়ে চিকিৎসা মহলে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার বার্তা, কোনও নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন কি না, তা রোগের কারণ এবং রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি দেখে চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।
সব জ্বরেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না
সাধারণ মানুষের জন্য এই নির্দেশিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হল—জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়।
কারণ জ্বর, সর্দি, কাশি বা গলা ব্যথার বহু কারণ ভাইরাসজনিত হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক মূলত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয় বলে জানিয়েছে WHO।
ফলে সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে রোগের কারণ দূর হবে না। বরং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারের ফলে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এই কারণেই শুধুমাত্র শরীরের তাপমাত্রা বেড়েছে বা সর্দি-কাশি হয়েছে বলে ফার্মেসি থেকে নিজের পছন্দমতো অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়ার অভ্যাস বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স আসলে কী?
Antimicrobial resistance বা AMR হল এমন একটি পরিস্থিতি, যখন জীবাণু সংশ্লিষ্ট ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে এবং চিকিৎসায় সেই ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়।
WHO-র সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ব্যবহার resistant জীবাণু তৈরির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। এর ফলে এমন সংক্রমণও ভবিষ্যতে চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, যা বর্তমানে তুলনামূলকভাবে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে শুধু তাঁর নিজের ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয় না। প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যের উপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।
প্রয়োজনের চেয়ে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক নয়
শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, চিকিৎসকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে।
রোগীর সংক্রমণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করা এবং অকারণে উচ্চমাত্রার বা বেশি শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা শুরু না করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিকের বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে। সব ধরনের সংক্রমণের জন্য একই ওষুধ প্রয়োজন হয় না। কোন ওষুধ কতটা প্রয়োজন, কতদিন দেওয়া হবে এবং রোগীর ক্ষেত্রে কোন ধরনের চিকিৎসা উপযুক্ত—তা নির্ভর করে রোগের কারণ, সংক্রমণের ধরন এবং রোগীর সামগ্রিক পরিস্থিতির উপর।
WHO-ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সংযম এবং সঠিক রোগ নির্ণয়ের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।
কেন ‘প্রথমেই কড়া ডোজ’ নিয়ে সতর্কতা?
অনেক ক্ষেত্রে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন—এই প্রত্যাশা থেকে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয়ভাবে উচ্চ-প্রভাবশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন করা। সংক্রমণের প্রকৃতি বুঝে চিকিৎসা শুরু করা এবং রোগীর অবস্থার ভিত্তিতে প্রয়োজনে চিকিৎসা পরিবর্তন করা গুরুত্বপূর্ণ।
এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে গুরুতর ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক অবশ্যই উপযুক্ত ওষুধ দিতে পারেন। সতর্কতার জায়গাটি হল—প্রয়োজন ছাড়া শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা।
পুরনো আইনেই প্রেসক্রিপশনের নিয়ম রয়েছে
অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশনের নিয়ম একেবারে নতুন কোনও ধারণা নয়। Drugs and Cosmetics Act, 1940 এবং Drugs Rules, 1945-এর অধীনে Schedule H ও Schedule H1 ওষুধের জন্য নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
Schedule H-এর ওষুধের লেবেলে Registered Medical Practitioner-এর প্রেসক্রিপশন ছাড়া খুচরো বিক্রি না করার সতর্কবার্তা থাকে। Schedule H1-এর ক্ষেত্রেও প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি নিষিদ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট ওষুধের প্যাকেটে নির্দিষ্ট সতর্কীকরণ উল্লেখ করার নিয়ম রয়েছে।
নতুন নির্দেশিকার গুরুত্ব তাই নিয়ম তৈরি করার চেয়ে বিদ্যমান নিয়ম বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, তার উপর নজরদারি বাড়ানোর জায়গাতেও রয়েছে।
ওষুধের দোকানগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বন্ধ করতে শুধু রোগী বা চিকিৎসককে সতর্ক করলেই হবে না। ওষুধের দোকানগুলিকেও নিয়ম মেনে বিক্রি করতে হবে।
কোন ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া দেওয়া যাবে না, তা নিয়ে ফার্মেসিগুলিকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনও নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হলে তা সংশ্লিষ্ট নিয়মের লঙ্ঘন হতে পারে।
বিশেষ করে কোনও রোগী পুরনো প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে একই ওষুধ আবার কিনতে চাইলে বা পরিবারের অন্য সদস্যের জন্য ওষুধ নিতে চাইলে ফার্মেসিগুলিরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা রোগীভেদে আলাদা হতে পারে।
ব্যথানাশক নিয়েও সতর্কতা কেন?
প্রেসক্রিপশন ছাড়া ‘পেনকিলার’ বিক্রি নিয়ে যে সতর্কবার্তার কথা সামনে এসেছে, সেটিকে সব ধরনের ব্যথানাশকের ক্ষেত্রে একই নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ওষুধের ধরন ও Schedule অনুযায়ী বিক্রির নিয়ম আলাদা হতে পারে।
তবে ব্যথানাশক ওষুধও নিজের মতো করে দীর্ঘদিন বা অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে কিছু painkiller নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে কিডনি, পেট বা অন্যান্য অঙ্গের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ব্যথা হলেই দীর্ঘদিন নিজের মতো করে ওষুধ খাওয়ার বদলে সমস্যার কারণ জানা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ পদ্ধতি।
কিডনি নিয়ে উদ্বেগের জায়গা কোথায়?
দীর্ঘদিন ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিয়ে কিডনি-সহ বিভিন্ন অঙ্গের উপর প্রভাবের বিষয়টি চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধুমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ হবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত ঠিক নয়।
কোন অ্যান্টিবায়োটিক, কী মাত্রায়, কতদিন এবং রোগীর আগে থেকে কোনও কিডনি সমস্যা রয়েছে কি না—এসবের উপর ওষুধের ঝুঁকি নির্ভর করতে পারে।
এই কারণেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনও ওষুধ দীর্ঘদিন খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে আগে থেকে কিডনির সমস্যা থাকলে ওষুধ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন।
মাঝপথে অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করাও ঠিক নয়
প্রেসক্রিপশন নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করার পর নিজের ইচ্ছায় কয়েকদিনের মধ্যে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া নিয়েও সতর্ক থাকা দরকার।
কতদিন ওষুধ চলবে, তা রোগ ও নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের উপর নির্ভর করে। চিকিৎসক যতদিনের কোর্স দেন, সেই নির্দেশ অনুসরণ করা উচিত।
অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে উপসর্গ কমে গেলেই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা বা পরে একই ওষুধের বাকি ট্যাবলেট অন্য কোনও অসুখে ব্যবহার করা ঠিক নয়। WHO-ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
নতুন নির্দেশিকার প্রেক্ষিতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না।
সর্দি-কাশি বা সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না।
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া Schedule H/H1 অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়া উচিত নয়।
অন্য কারও প্রেসক্রিপশনের ওষুধ নিজের জন্য ব্যবহার করা ঠিক নয়।
অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করার পর কতদিন চলবে, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা উচিত।
WHO-র মতে, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমানো AMR নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
কেন এখনই এই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ?
অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ। নিউমোনিয়া, রক্তের সংক্রমণ, মূত্রনালির ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণসহ বহু গুরুতর রোগে এগুলি জীবনরক্ষাকারী হতে পারে।
কিন্তু যে ওষুধ প্রয়োজনের সময় জীবন বাঁচাতে পারে, সেটিই যদি অপ্রয়োজনে বা ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তার কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
WHO-র ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া সাধারণ ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রায় প্রতি ছয়টির একটি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ছিল।
তাই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ শুধু ওষুধের দোকানের নিয়ম মানার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
এখন নজর নিয়ম কতটা কার্যকরভাবে মানা হয়
নির্দেশিকা জারি হলেই অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বন্ধ হয়ে যাবে না। চিকিৎসক, ফার্মেসি এবং রোগী—তিন পক্ষকেই নিয়ম মেনে চলতে হবে।
চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন, ফার্মেসির ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন-নির্ভর বিক্রি এবং সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আত্মনির্ভর চিকিৎসা বন্ধ করা—এই তিনটি দিক গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্টিবায়োটিক যে রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন, সেই রোগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সাধারণ ভাইরাল জ্বর বা সর্দি-কাশির মতো উপসর্গে নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়।
সব মিলিয়ে, CDSCO-র নতুন সতর্কবার্তার মূল লক্ষ্য অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ ব্যবহার কমানো এবং ভবিষ্যতের জন্য ওষুধগুলির কার্যকারিতা ধরে রাখা। প্রেসক্রিপশন ছাড়া নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করা, চিকিৎসকদের প্রয়োজনভিত্তিক ওষুধ বেছে নেওয়ার উপর জোর এবং সাধারণ মানুষকে আত্মনির্ভর চিকিৎসা থেকে বিরত থাকার বার্তা—এই তিন স্তরেই এখন নজর। অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা রক্ষা করতে নিয়ম মানাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



