মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথ ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে ওমানের উপকূলবর্তী এলাকায় ফের হামলার শিকার হয়েছে ভারতীয় নাবিক বহনকারী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এটি তৃতীয় এমন ঘটনা, যেখানে ভারতীয় নাবিকদের উপস্থিতি থাকা জাহাজ নিরাপত্তা সঙ্কটে পড়েছে।
ওমানের শিনাস বন্দরের কাছাকাছি সমুদ্রসীমায় বৃহস্পতিবার সকালে এই ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। আক্রান্ত জাহাজটির নাম ‘এমটি জলবীর’। জাহাজটিতে প্রায় ২০ জন ভারতীয় নাবিক কর্মরত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। তবে হামলার ধরন, হামলাকারীদের পরিচয় কিংবা ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ সম্পর্কে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে দেখা গিয়েছে, সমুদ্রের মাঝে একটি জাহাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদিও সেই ছবি আক্রান্ত জাহাজেরই কি না, তা এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবু ঘটনাটি ঘিরে আন্তর্জাতিক শিপিং মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ওমানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জানিয়েছে, তারা গোটা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শিনাস বন্দরের কাছে একটি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে এবং ঘটনার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বর্তমানে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
এই হামলার সঙ্গে মার্কিন সামরিক তৎপরতার কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ এর আগে গত কয়েক দিনে ওমান উপসাগর অঞ্চলে ভারতীয় নাবিক থাকা দুটি পৃথক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ উঠেছিল মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে।
বুধবার পালাউয়ের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ওই জাহাজে মোট ২৮ জন নাবিকের মধ্যে ২৪ জন ভারতীয় ছিলেন। হামলার পর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে অধিকাংশ নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়। সেই ঘটনাই ইতিমধ্যে ভারতজুড়ে আলোড়ন ফেলেছে।
তারও আগে সপ্তাহের শুরুতে আরেকটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যতরী হামলার মুখে পড়ে। সেখানে কর্মরত ভারতীয় নাবিকদের প্রাণহানি না ঘটলেও জাহাজটির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছিল বলে জানা যায়। ফলে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ভারতীয় নাবিকদের জড়িয়ে একের পর এক হামলার ঘটনা কেন্দ্রীয় সরকার এবং কূটনৈতিক মহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলির সংঘাতের জেরে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ এখন ঝুঁকির মুখে। ওমান উপসাগর এবং সংলগ্ন জলসীমা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক রুট। প্রতিদিন শতাধিক তেলবাহী ও পণ্যবাহী জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে। ফলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাবিক কর্মরত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক শিপিং শিল্পে ভারতীয়দের উপস্থিতি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। তাই বিদেশি জলসীমায় এই ধরনের হামলা শুধু মানবিক উদ্বেগই নয়, কূটনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নৌ-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত হামলার নেপথ্যে কোনও নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ করা ঠিক হবে না। তবে ঘটনাগুলির সময়কাল এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে আন্তর্জাতিক সামরিক উত্তেজনার প্রভাব উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকও পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে বলে জানা গিয়েছে। আক্রান্ত জাহাজের নাবিকদের অবস্থা, তাঁদের নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের পথও খোলা রাখা হয়েছে।
এদিকে সমুদ্রপথে কর্মরত ভারতীয় নাবিকদের পরিবারগুলির মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এখন সরাসরি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে প্রভাবিত করছে। ফলে ভবিষ্যতে এমন হামলা রুখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার দাবি উঠতে শুরু করেছে।
ওমান উপকূলে সর্বশেষ হামলার প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের পরিচয় সামনে আসতে এখনও সময় লাগতে পারে। তবে একের পর এক ঘটনায় স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক অঞ্চল এখন বিশ্বের অন্যতম স্পর্শকাতর নিরাপত্তা ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। আর সেই সংঘাতের অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন সমুদ্রে কর্মরত সাধারণ নাবিকরাই।



