খলিস্তানি নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এল। মার্কিন তদন্তকারী সংস্থা এফবিআইয়ের দাখিল করা চার্জশিটে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গোল্ডি ব্রারের নাম উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এই হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
এই মামলার তদন্ত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের একাধিক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যৌথভাবে অভিযান চালায়। সেই অভিযানে মোট ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজনকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া, ইন্ডিয়ানা এবং জর্জিয়া থেকে ধরা হয়েছে। এছাড়া কানাডা ও স্পেনেও একাধিক অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এই হত্যাকাণ্ডে অন্তত তিনটি সংগঠিত অপরাধচক্র সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। সব মিলিয়ে ৩৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে বলা হয়েছে, এই অপরাধচক্রগুলির একটির নেতৃত্বে ছিলেন লরেন্স বিষ্ণোই। পাশাপাশি গোল্ডি ব্রারও পরিকল্পনা ও নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে অভিযোগ।
২০২৩ সালের হত্যাকাণ্ড
২০২৩ সালের ১৮ জুন কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারে শহরের একটি গুরুদ্বারের বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয় হরদীপ সিং নিজ্জরকে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই খলিস্তানপন্থী আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গুরুদ্বার থেকে বেরোনোর পরই তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু কানাডার অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার বিষয় ছিল না। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। ভারত ও কানাডার সম্পর্কেও এর বড় প্রভাব পড়ে।
ভারত-কানাডা সম্পর্কে টানাপোড়েন
হত্যার কয়েক মাস পর কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ভারতীয় সরকারি সংস্থার সম্ভাব্য যোগসূত্রের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তাঁর সেই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ভারত সরকার সেই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয় এবং কানাডার বক্তব্যের কড়া প্রতিবাদ জানায়। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। উভয় দেশই একে অপরের কূটনীতিকদের বহিষ্কারসহ একাধিক পাল্টা পদক্ষেপ নেয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের মে মাসে কানাডার পুলিশ নিজ্জর হত্যা মামলায় চার ভারতীয় এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে খুন এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল। যদিও পরে আদালত থেকে তাঁরা জামিন পান।
এদিকে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রিপোর্টে স্পষ্ট হতে থাকে যে, এই হত্যাকাণ্ডে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ ভূমিকার অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্তের ফোকাস ধীরে ধীরে সংগঠিত অপরাধচক্র এবং আন্তঃদেশীয় গ্যাং নেটওয়ার্কের দিকে ঘুরে যায়।
বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ
লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম বহু বছর ধরেই ভারতের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। খুন, তোলাবাজি, অস্ত্র পাচার, মাদক ব্যবসা এবং সংগঠিত অপরাধের একাধিক মামলায় তাঁর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। জেলবন্দি অবস্থাতেও বিষ্ণোই তার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন বলে বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থা আগেই দাবি করেছে।
গোল্ডি ব্রারকে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশে অবস্থান করে সংগঠনের কার্যকলাপ পরিচালনা করছেন বলে বিভিন্ন তদন্তে উঠে এসেছে। বিদেশে বসেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্যাং পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ভারতের একাধিক হাই-প্রোফাইল অপরাধের তদন্তেও বিষ্ণোই-ব্রার চক্রের নাম উঠে এসেছে। বলিউড অভিনেতা সালমান খানকে প্রাণনাশের হুমকি, পঞ্জাবের গায়ক সিধু মুসেওয়ালার হত্যাকাণ্ডসহ একাধিক ঘটনায় এই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক তদন্তে নতুন দিশা
এফবিআইয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এই মামলার তদন্তকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত অভিযানের ফলেই এত বড় সাফল্য এসেছে।
আদালতে জমা দেওয়া নথিতে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, অর্থের লেনদেন, যোগাযোগের মাধ্যম এবং বিভিন্ন অপরাধচক্রের পারস্পরিক সংযোগের বিষয়ে একাধিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেই সূত্র ধরেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীরা এখন প্রত্যেক অভিযুক্তের নির্দিষ্ট ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রগুলির আর্থিক লেনদেন, অস্ত্র সরবরাহ এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্ক সম্পর্কেও বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে।
তদন্তের দিকে নজর আন্তর্জাতিক মহলের
হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যা মামলাটি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্র কীভাবে বিভিন্ন দেশে সক্রিয় থেকে বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত করছে, এই তদন্ত তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এফবিআইয়ের চার্জশিট এবং ২৪ জনের গ্রেপ্তারের পর তদন্ত আরও এগোবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আগামী দিনে আদালতের শুনানি এবং নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে এই মামলায় আরও গ্রেপ্তার বা অতিরিক্ত অভিযোগপত্র জমা পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।



