তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আয়োজিত রাষ্ট্রীয় শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের কফিনের পাশেই রাখা হয়েছিল তাঁর ১৪ মাসের নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানির কফিন। বড় কফিনের পাশে ছোট্ট কফিনটির উপস্থিতি অনুষ্ঠানে আসা বহু মানুষের আবেগকে নাড়া দেয়।
ইসলামিক রিপাবলিকের সবুজ, সাদা ও লাল জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল সব কফিন। খামেনেইয়ের কফিনের উপর রাখা হয়েছিল তাঁর পরিচিত কালো পাগড়ি। ঠিক তার পাশেই রাখা ছোট আকারের কফিনে ছিল শিশুকন্যা জাহরার মরদেহ। কফিনের সামনে রাখা একটি ছবিতে দেখা যায়, নীল চোখের শিশুটি মুখে চুষনি নিয়ে হাসিমুখে রয়েছে।
ইরানের সরকারি দাবি অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশটিতে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় খামেনেই, তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং জাহরা নিহত হন। তবে এই ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
শুক্রবার প্রথমে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সামরিক কর্তারা এবং বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি খামেনেইকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। শনিবার থেকে সাধারণ মানুষের জন্য অনুষ্ঠানস্থল খুলে দেওয়া হলে হাজার হাজার মানুষ সেখানে ভিড় করেন।
অনেকের হাতেই ছিল লাল পতাকা, যা ইরানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনতার একাংশ যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ও প্রতিশোধের দাবিতে স্লোগানও দেন। গোটা অনুষ্ঠানজুড়ে নিরাপত্তা ছিল অত্যন্ত কড়া।
ইরানের ঘোষণা অনুযায়ী, খামেনেই এবং তাঁর পরিবারের নিহত সদস্যদের শেষযাত্রা একাধিক শহর ঘুরে সম্পন্ন হবে। কয়েকদিন তেহরানে মরদেহ রাখা হবে যাতে সাধারণ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। এরপর কুম এবং পরে ইরাকের বিভিন্ন শহরে নিয়ে যাওয়া হবে কফিনগুলি। শেষপর্যায়ে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশাদে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শেষকৃত্য উপলক্ষে নিরাপত্তা জোরদার করেছে ইরান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অনুষ্ঠান চলাকালীন কোনও ধরনের সামরিক হামলা বা নাশকতার চেষ্টা হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধি তেহরানে পৌঁছেছেন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিটা এবং বিহারের রাজ্যপাল অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল সৈয়দ আতা হাসনাইন উপস্থিত রয়েছেন। ইরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসও সামাজিক মাধ্যমে শোকবার্তা প্রকাশ করেছে। সেই পোস্টে ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের শ্রদ্ধা নিবেদনের ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া রাশিয়া, ইরাক, আর্মেনিয়া, তুর্কমেনিস্তান-সহ একাধিক দেশের সরকারি প্রতিনিধি উপস্থিত রয়েছেন। বাংলাদেশ, ওমান, উজবেকিস্তান, আজারবাইজান, বেলারুস, কিরঘিস্তান, নিকারাগুয়া, কঙ্গো ও আরও কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। সৌদি আরব ও তুরস্কও সরকারি প্রতিনিধি পাঠিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যেসব দেশ সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের অবস্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে, তাদের এই রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
এই শেষবিদায় শুধু একজন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতার প্রতি রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধাই নয়, বরং সাম্প্রতিক সংঘাতে নিহত তাঁর পরিবারের সদস্যদের স্মরণেও পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে শিশু জাহরার কফিনের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন প্রতীক হয়ে ওঠে এবং উপস্থিত মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।



