পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র কাতারের রাস লাফান শিল্পনগরীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিস্ফোরণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কাতারের প্রধান এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র বারজান গ্যাস সরবরাহ প্লান্টে রবিবার রাতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক হিসাবে জানা গিয়েছে, প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন। তাঁদের মধ্যে ১২ জনই ভারতীয় নাগরিক। আহত হয়েছেন আরও ৬৬ জন, যাঁদের বড় অংশ ভারত ও পাকিস্তানের কর্মী।
দুর্ঘটনার পর দোহায় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস মৃতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে। দূতাবাসের তরফে জানানো হয়েছে, কাতার প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রেখে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। আহত ভারতীয়দের চিকিৎসা এবং নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও শুরু হয়েছে।
কাতারের শক্তি মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণটি ঘটেছে রাস লাফানের বারজান গ্যাস কেন্দ্রে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোর অংশ। গত মার্চে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের সময় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এই অঞ্চলের গ্যাস পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে মেরামতির কাজ চলছিল এবং ধীরে ধীরে উৎপাদন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল।
জানা গিয়েছে, দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর মাত্র দু'দিন আগে পুনরায় চালু করা হয়েছিল প্লান্টের কার্যক্রম। সেই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্যেই ঘটে যায় এই বিপর্যয়। প্রাথমিক তদন্তে যান্ত্রিক ত্রুটির ইঙ্গিত মিললেও বিস্ফোরণের সঠিক কারণ জানতে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে।
বিস্ফোরণের অভিঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে রাস লাফান থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের মধ্য দোহা পর্যন্ত কম্পন অনুভূত হয়। বহু জায়গায় জানালার কাচ কেঁপে ওঠে এবং রাতের অন্ধকারে বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে আগুনের বিশাল শিখা এবং আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা গিয়েছে।
তবে কাতার প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক হলেও এর ফলে কোনও পরিবেশগত বিপর্যয় বা গ্যাস লিকজনিত বৃহৎ ঝুঁকি তৈরি হয়নি। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং উদ্ধারকারী দল রাতভর অভিযান চালিয়ে আহতদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যায়।
এই দুর্ঘটনায় ভারতীয়দের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে বিদেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কাতারের জ্বালানি শিল্পে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কর্মরত রয়েছেন। নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কারিগরি পরিষেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আইনি ও প্রশাসনিক সব ধরনের সহায়তাও দেওয়া হবে। একইসঙ্গে আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি এবং নিহতদের পরিচয় সংক্রান্ত প্রক্রিয়াও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
বিশ্বের জ্বালানি বাজারেও এই দুর্ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ। রাস লাফান শিল্পনগরী কাতারের গ্যাস রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় অতীতে এখানকার উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তার প্রভাব পড়েছে। যদিও প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি কোনও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা নেই এবং দ্রুত স্বাভাবিক উৎপাদনে ফেরার চেষ্টা চলছে।
তবে কাতারের এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ বহু পরিবারের জীবনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ১২ ভারতীয়ের মৃত্যুতে শোকের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এখন সকলের নজর তদন্তের ফলাফল এবং নিহতদের মরদেহ দ্রুত স্বজনদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়ার দিকে।



