ইউরোপজুড়ে তীব্র দাবদাহ
গ্রীষ্মের শুরুতেই নজিরবিহীন গরমে নাজেহাল ইউরোপ। সাধারণত যেসব দেশে মাঝারি তাপমাত্রাই স্বাভাবিক, সেখানেও এবার রেকর্ড ভাঙছে পারদ। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, ক্রোয়েশিয়া, ব্রিটেন-সহ একাধিক দেশে টানা কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা তারও বেশি রয়েছে।
অত্যধিক গরমের জেরে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনের বেলায় বাইরে বেরোনো এড়াতে পরামর্শ দিচ্ছে প্রশাসন। অনেক শহরে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে, বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং দীর্ঘদিনের অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য।
গলে যাচ্ছে রাস্তা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো
এই তাপপ্রবাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ইউরোপের পরিকাঠামোর উপর। জার্মানির একাধিক এলাকায় অতিরিক্ত তাপের কারণে রাস্তার বিটুমিন নরম হয়ে ফেটে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও রাস্তার পিচ ফুলে উঠে যান চলাচলে সমস্যা তৈরি করছে।
শুধু রাস্তা নয়, প্রবল গরমে ট্রামলাইনের ধাতব রেলও প্রসারিত হয়ে বেঁকে যাচ্ছে। ফলে কয়েকটি শহরে ট্রাম পরিষেবা সীমিত বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের মতে, এত দীর্ঘ সময় ধরে এত উচ্চ তাপমাত্রা ইউরোপের বহু শহরের পরিকাঠামোকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ভাইরাল হচ্ছে একের পর এক ভিডিও
সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক ভিডিও ও ছবি। যদিও সব কটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কিছু ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, রোদে রাখা ধাতব পাত্রে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডিম ও বেকন রান্না হয়ে যাচ্ছে। অন্য একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে, জার্মানির একটি শহরে তাপের কারণে ট্রামলাইন বিকৃত হয়ে গিয়েছে। আবার নেদারল্যান্ডসের কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির প্লাস্টিক অংশ ও রঙ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও মানুষের জুতোর তলাও নরম হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এই সমস্ত ভিডিও ইউরোপের চলতি তাপপ্রবাহ কতটা ভয়াবহ আকার নিয়েছে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।
গরম মোকাবিলায় প্রশাসনের বিশেষ ব্যবস্থা
পরিস্থিতি সামাল দিতে একাধিক দেশের স্থানীয় প্রশাসন জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে।
জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বিভিন্ন এলাকায় জলকামান ব্যবহার করে রাস্তার তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা চলছে। বহু শহরে অস্থায়ী কুলিং সেন্টার খোলা হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ গিয়ে বিশ্রাম নিতে ও ঠান্ডা পরিবেশে কিছু সময় কাটাতে পারছেন।
এছাড়া পর্যাপ্ত জলপান, অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনো এবং দুপুরের তীব্র রোদ এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বন্ধ স্কুল-কলেজ, বদলাচ্ছে দৈনন্দিন জীবন
প্রবল তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে অথবা ক্লাসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কিছু জায়গায় সরকারি কর্মীদেরও বাড়ি থেকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজ, কৃষিকাজ এবং বাইরের শ্রমনির্ভর পেশায় কর্মরতদের জন্যও আলাদা স্বাস্থ্যবিধি জারি করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপও বেড়ে গিয়েছে। এয়ার কন্ডিশনার ও কুলিং ব্যবস্থার অতিরিক্ত ব্যবহারে বিদ্যুৎ চাহিদা রেকর্ড ছুঁয়েছে কয়েকটি দেশে।
মৃতের সংখ্যা বাড়ছে
তাপপ্রবাহের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাবে ইতিমধ্যেই অন্তত ১,৩০০ জনের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ফ্রান্স, যেখানে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত তাপের ফলে হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন, হৃদ্রোগ এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি আরও বেশি।
WHO-র উদ্বেগ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থার মতে, ইউরোপ বিশ্বের গড় উষ্ণায়নের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত হারে উষ্ণ হয়ে উঠছে।
WHO-র বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে ইউরোপে আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র গরমের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে নতুন আলোচনা
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এবারের তাপপ্রবাহ আবারও প্রমাণ করল যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা। শুধু মানুষের স্বাস্থ্য নয়, পরিবহণ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, কৃষি এবং নগর পরিকাঠামো— সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আগামী কয়েকদিনেও ইউরোপের বহু দেশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। ফলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।



