ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘ চার বছরের যুদ্ধ কি এ বার থামতে চলেছে? আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে এই প্রশ্নই। শনিবার মস্কোয় বিজয় দিবস অনুষ্ঠানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের এক মন্তব্য ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। তাঁর কথায় স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে, রাশিয়া হয়তো এ বার ইউক্রেনের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোতে চাইছে।
বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পুতিন বলেন, “আমার মনে হয়, বিষয়টি এ বার থামবে।” ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাঁর এই মন্তব্যকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই মন্তব্য এল, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত তিন দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে দুই দেশই। পাশাপাশি বন্দি বিনিময় নিয়েও ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে মস্কো ও কিয়েভ।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসবেন কি না, সেই প্রশ্নও ওঠে সাংবাদিক বৈঠকে। জবাবে পুতিন জানান, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হলে তবেই আলোচনা সম্ভব। অর্থাৎ, যুদ্ধবিরতি এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলে গেলে জ়েলেনস্কির সঙ্গে আলোচনার দরজাও বন্ধ নয় বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
পুতিনের এই মন্তব্যের পর ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহলেও নড়াচড়া শুরু হয়েছে। ইউরোপের এক কূটনীতিক জানিয়েছেন, “মনে হচ্ছে, মস্কো প্রথমবার স্পষ্টভাবে বোঝাতে চাইছে যে আলোচনা আর অসম্ভব নয়।” গত কয়েক বছরে একাধিকবার শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেলেও এ বার পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
চলতি বছরের বিজয় দিবস উদযাপনেও ছিল কিছু ব্যতিক্রমী ছবি। সাধারণত মস্কোর রাস্তায় বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজ, ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া গাড়ির প্রদর্শনী দেখা যায়। কিন্তু এ বার সেই জাঁকজমক তুলনায় অনেকটাই কম ছিল। সেন্ট্রাল মস্কোর রাস্তায় ভারী সাঁজোয়া বাহিনীর বদলে বড় স্ক্রিনে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের প্রদর্শনী করা হয়। ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনারাই মূলত কুচকাওয়াজে অংশ নেন।
ক্রেমলিনের সামনে দেওয়া আট মিনিটের ভাষণে পুতিন রুশ সেনাদের প্রশংসা করেন এবং পশ্চিমি সামরিক জোট ন্যাটোর বিরুদ্ধেও পরোক্ষে বার্তা দেন। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়েও নরম সুর শোনা যায় তাঁর বক্তব্যে। তিনি জানান, জার্মানির প্রাক্তন চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডারের মতো নেতাদের সঙ্গে আলোচনাকে তিনি গুরুত্ব দেন।
গত সপ্তাহেই পুতিন বলেছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সমঝোতার প্রথম পদক্ষেপ ইউরোপকেই নিতে হবে। শনিবারের বক্তব্যে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট হল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, দীর্ঘ যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই হয়তো রাশিয়া এখন আলোচনার রাস্তা খোলা রাখতে চাইছে।
অন্য দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর কথায়, “আমি এই যুদ্ধের ইতি দেখতে চাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতিগুলির একটি।”
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। তারপর থেকে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। ইউক্রেনের বহু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে পুতিনের এই মন্তব্য বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে আশার আলো জাগাচ্ছে।
তবে কূটনৈতিক মহলের একাংশ এখনও সতর্ক। তাঁদের মতে, শুধুমাত্র বক্তব্য নয়, বাস্তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া এবং স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের রূপরেখা তৈরি হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন নজর থাকবে আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ এবং সম্ভাব্য রাশিয়া-ইউক্রেন আলোচনার দিকেই।



