নতুন করে উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য
কয়েক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর আবারও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পশ্চিম এশিয়া। সাম্প্রতিক হামলা ও পালটা হামলার জেরে ইরান-ইজরায়েল সম্পর্ক আরও তলানিতে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি এমন এক সময়ে জটিল হয়ে উঠেছে, যখন ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার দিকে এগোচ্ছিল বলে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছিল।
এই প্রেক্ষাপটে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেনি, বরং মার্কিন কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকেও চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
নেতানিয়াহুর পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, তিনি নতুন সংঘাত চান না। তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর যখন আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তখন সামরিক অভিযান পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তিনি ইজরায়েলি নেতৃত্বকে আগে থেকেই সংযম বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল যে, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক মহলে ইজরায়েলের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই অবস্থান আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি মনে করছেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানকে ঘিরে বহুদিনের আলোচনার অগ্রগতি ভেস্তে যেতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের বার্তা: আত্মরক্ষায় আপস নয়
ইজরায়েলের হামলার পর ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেস্কিয়ানও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশের নিরাপত্তা এবং জনগণের সুরক্ষা ইরান সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, কোনও ধরনের চাপ বা হুমকির সামনে ইরান মাথা নত করবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে একইসঙ্গে তিনি জানান, কূটনৈতিক সংলাপের দরজাও বন্ধ করা হচ্ছে না। সংঘাতের মধ্যেও আলোচনা এবং রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা বজায় রাখতে চায় তেহরান। ফলে একদিকে প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতি, অন্যদিকে আলোচনার সুযোগ— দুই পথই খোলা রাখছে ইরান।
কীভাবে শুরু হল নতুন সংঘাত?
ঘটনার সূত্রপাত লেবাননের রাজধানী বেইরুটে একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে। ইজরায়েল দাবি করে, তাদের লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির নির্দিষ্ট ঘাঁটি। সেই ঘটনার পরপরই পালটা প্রতিক্রিয়ার অভিযোগ ওঠে ইরানের বিরুদ্ধে।
এর জবাবে সোমবার ভোর থেকে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বিমান হামলা চালায় ইজরায়েল। রাজধানী তেহরান ছাড়াও ইসফাহান, তাবরিজ এবং আরও কয়েকটি কৌশলগত এলাকাকে লক্ষ্য করা হয়েছে বলে খবর।
ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তাদের অভিযান শুধুমাত্র সামরিক অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত স্থাপনাগুলির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে। তবে হামলার জেরে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
আকাশসীমা বন্ধ, সতর্ক আন্তর্জাতিক মহল
হামলার পরপরই ইরান নিজেদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের উপরও এর প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থাগুলি বিকল্প রুট ব্যবহার করতে শুরু করেছে বলে জানা গিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক দেশই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। রাষ্ট্রসংঘ-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বৃহৎ সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, ইরানকে ঘিরে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সমঝোতা বা চুক্তির ভবিষ্যৎ কী হবে? মার্কিন প্রশাসন যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে আগ্রহী ছিল, তা ট্রাম্পের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট।
কিন্তু নতুন করে সামরিক সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ইজরায়েলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ মূলত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত হিসাব-নিকাশের অংশ হতে পারে। অন্যদিকে, আমেরিকা চাইছে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখে আলোচনার পথ সচল রাখতে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব গোটা পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির উপর পড়তে পারে। ফলে আগামী কয়েকদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একদিকে সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা— এই দুইয়ের টানাপোড়েনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ট্রাম্পের কড়া বার্তা এবং ইরানের পালটা অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর পর্যায়ে পৌঁছেছে।



