জি-৭ সম্মেলনের মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের প্রস্তুতি
আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সে শুরু হতে চলেছে জি-৭ সম্মেলন। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলির এই বার্ষিক বৈঠকে বিশেষ আমন্ত্রিত দেশ হিসেবে অংশ নিতে চলেছে ভারতও। সূত্রের খবর, সেই সম্মেলনের ফাঁকেই মুখোমুখি হতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসের তরফে ইতিমধ্যেই এই সম্ভাব্য বৈঠকের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবাদ সংস্থা এপি-কে মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি, বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য— সবকিছুই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে।
দেড় বছর পর আবার মুখোমুখি দুই নেতা
মোদি ও ট্রাম্পের এই বৈঠক কূটনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, গত প্রায় দেড় বছর ধরে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে কোনও সরাসরি বৈঠক হয়নি। শেষবার তাঁরা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
এরপর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহু পরিবর্তন এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত, বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা এবং জ্বালানি বাজারে টানাপোড়েন— সবকিছুর মধ্যেই এবার নতুন করে আলোচনায় বসতে চলেছেন দুই নেতা। ফলে এই বৈঠক থেকে কী বার্তা বেরিয়ে আসে, সেদিকে নজর রয়েছে কূটনৈতিক মহলের।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২২ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী অতিক্রম করে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও এই পথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে।
ফলে হরমুজে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে পরিবহণ খরচ, মুদ্রাস্ফীতি এবং উৎপাদন ব্যয়— সবকিছুর উপরই এর প্রভাব পড়ে।
ভারতের জন্য বাড়তি উদ্বেগ
ভারতের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির উপর নির্ভরশীল। দেশের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের অধিকাংশই হরমুজ প্রণালী হয়ে ভারতে আসে। ফলে এই সামুদ্রিক পথের অনিশ্চয়তা ভারতের জন্য কেবল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিষয় নয়, বরং সরাসরি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উদ্বেগের কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল থাকলে ভারতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম, পরিবহণ ব্যয় এবং সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির উপরও।
এই পরিস্থিতিতে মোদি-ট্রাম্প বৈঠকে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহের বিকল্প পথ নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ভারতীয় জাহাজে হামলার ঘটনাও আলোচনায়
গত কয়েক দিনে ওমান উপকূলে ভারতীয় নাবিকদের বহনকারী একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দ্বিতীয় হামলায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এই ঘটনাগুলি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক তৎপরতাও বেড়েছে। ফলে ভারতীয় নাবিকদের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে চলাচল এবং বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষা নিয়েও মোদি ও ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
জি-৭ মঞ্চে ভারতের বাড়তি গুরুত্ব
ভারত জি-৭ গোষ্ঠীর স্থায়ী সদস্য নয়। তবু গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি হিসেবে ভারতকে নিয়মিত বিশেষ আমন্ত্রিত দেশ হিসেবে ডাকা হচ্ছে।
এবারও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ প্রধানমন্ত্রী মোদিকে সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিশ্বের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ভারতের অবস্থান এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তার কৌশলগত গুরুত্ব জি-৭ দেশগুলির কাছে ক্রমেই বাড়ছে।
এই আবহে মোদি-ট্রাম্প বৈঠক শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নিরিখেই নয়, বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির দিক থেকেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের নজর এখন জি-৭ সম্মেলনের দিকে
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, হরমুজের অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার সময়ে মোদি ও ট্রাম্পের বৈঠক থেকে কোনও ইতিবাচক বার্তা বেরিয়ে আসে কি না, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সমুদ্রপথের সুরক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কোনও নতুন উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায় কি না, তা এখন দেখার অপেক্ষা।



