ডেঙ্গুর টিকা কবে পাওয়া যাবে?
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকর টিকার অপেক্ষায় দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসা মহল এবং সাধারণ মানুষ। এবার সেই অপেক্ষার অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রবিবার কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ICMR-এর ডিজি। সেখানে বক্তব্য রাখার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, ডেঙ্গুর প্রস্তাবিত টিকার দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। সেই পরীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল উৎসাহজনক বলেই জানা গিয়েছে।
তবে এখনও টিকা বাজারে আনার পর্যায় আসেনি। বর্তমানে তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। এই পর্যায়ের ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষায় টিকার কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষজনক ফল পাওয়া গেলে তবেই পরবর্তী প্রক্রিয়া এগোবে।
এর পর প্রয়োজন হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন। সমস্ত ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী বছর ডেঙ্গুর টিকা সাধারণ মানুষের নাগালে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
‘ডেঙ্গিঅল’—ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি টিকা
প্রস্তাবিত ডেঙ্গু টিকার নাম ‘ডেঙ্গিঅল’। ICMR এবং প্যানাসিয়া বায়োটেক যৌথভাবে ভারতীয় প্রযুক্তিতে এই টিকা তৈরি করছে।
টিকাটি ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান সেরোটাইপ—DEN-1, DEN-2, DEN-3 এবং DEN-4—এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
ডেঙ্গু ভাইরাসের একাধিক ধরন থাকার কারণে কার্যকর টিকা তৈরি করা বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত টিকাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এটিকে এক ডোজের ভ্যাকসিন হিসেবে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি একটি live attenuated বা দুর্বল করা জীবন্ত ভাইরাস-ভিত্তিক ভ্যাকসিন। অর্থাৎ টিকা তৈরিতে এমন ভাইরাস ব্যবহার করা হয়, যাকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে যাতে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
তবে চূড়ান্তভাবে টিকাটি কতটা কার্যকর এবং নিরাপদ, তা নির্ধারণ করবে তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল এবং পরবর্তী নিয়ন্ত্রক মূল্যায়ন।
২০২৪ সালেই শুরু তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা
ডেঙ্গুর প্রস্তাবিত টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ২০২৪ সালে শুরু হয়েছিল। দেশের ১৯টি কেন্দ্রে মোট ১০ হাজার ৩৩৫ জনকে নিয়ে এই পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু করা হয়।
বড় সংখ্যক অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষা চালানোর উদ্দেশ্য হল টিকার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা।
দ্বিতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় প্রাথমিক ফলাফল ভালো পাওয়ার পরই তৃতীয় পর্যায়ের দিকে এগোনো হয়। তবে কোনও ভ্যাকসিন সাধারণ মানুষের জন্য ব্যবহারের আগে শেষ পর্যায়ের পরীক্ষার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় পর্যায়ের ফলাফলে যদি টিকার কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়, তাহলেই অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগোতে পারে।
তাই এখনই ডেঙ্গুর টিকা বাজারে এসে গিয়েছে, এমনটা বলা যাবে না। বরং ২০২৭ সালে টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তার জন্য এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পূর্ণ হওয়া বাকি।
চার ধরনের ডেঙ্গুর বিরুদ্ধেই প্রতিরোধের লক্ষ্য
ডেঙ্গু ভাইরাসের একাধিক সেরোটাইপ রয়েছে। প্রস্তাবিত ডেঙ্গিঅল টিকাটি চার ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে।
DEN-1, DEN-2, DEN-3 এবং DEN-4—এই চারটি সেরোটাইপকে লক্ষ্য করেই টিকাটি তৈরি হয়েছে। ফলে একটি টিকার মাধ্যমে ডেঙ্গুর বিভিন্ন ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
এক ডোজের টিকা হিসেবে এটি বাজারে এলে টিকাকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সুবিধা হতে পারে। তবে বাস্তবে কতটা সুরক্ষা পাওয়া যাবে, কতদিন সেই সুরক্ষা বজায় থাকবে এবং কোন বয়স বা ঝুঁকির গোষ্ঠীর জন্য টিকাটি উপযুক্ত হবে—এসব তথ্য চূড়ান্ত ট্রায়াল ও অনুমোদনের পরই স্পষ্ট হবে।
পুজোর আগে রাজ্যে ডেঙ্গু নিয়ে বাড়ছে নজরদারি
এদিকে উৎসবের মরশুম শুরু হওয়ার আগে রাজ্যে ডেঙ্গুর বাড়বাড়ন্ত নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্যদপ্তর। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
ডেঙ্গুর সংক্রমণ চিহ্নিত করতে নির্দিষ্ট এলাকাগুলিতে পরীক্ষার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জায়গায় আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি, সেগুলিকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করে অতিরিক্ত নজর দেওয়া হচ্ছে।
রাজ্যের মোট ৮৫টি ব্লক, ২৭৮টি গ্রাম পঞ্চায়েত এবং ২৯টি পুরসভা ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই এলাকাগুলিতে নজরদারি, পরীক্ষা এবং সচেতনতা কর্মসূচিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পুজোর প্যান্ডেলেও নজর স্বাস্থ্যদপ্তরের
শুধু আবাসিক এলাকা বা ডেঙ্গু হটস্পট নয়, পুজোর প্যান্ডেলগুলিকেও নজরদারির আওতায় আনছে স্বাস্থ্যদপ্তর।
বর্ষাকালে প্যান্ডেল বা তার আশপাশে কোথাও জল জমে থাকলে সেখানে এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। তাই পুজো উদ্যোক্তাদেরও সতর্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যদপ্তরের আধিকারিকরা বিভিন্ন পুজো কমিটির সঙ্গে কথা বলছেন। প্যান্ডেল চত্বর এবং আশপাশের এলাকায় জল জমতে না দেওয়া, জমা জল নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।
উৎসবের সময় বিপুল সংখ্যক মানুষের জমায়েত হওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আগাম ব্যবস্থা নেওয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।
টিকা এলেও সচেতনতা জরুরি
ডেঙ্গুর টিকা বাজারে এলেও মশাবাহিত এই রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র টিকাকরণ যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং জমা জল পরিষ্কার রাখার মতো পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে বর্ষাকালে বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র বা অন্য কোনও জায়গায় জমে থাকা জলে মশার লার্ভা তৈরি হতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যদপ্তরের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকেও জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।
২০২৭-এ কি বদলাবে ডেঙ্গু মোকাবিলার ছবি?
বর্তমানে ডেঙ্গুর কোনও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ভারতীয় এক-ডোজ টিকা সাধারণ মানুষের হাতে নেই। সেই জায়গায় ‘ডেঙ্গিঅল’-এর তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল সফল হলে এবং অনুমোদন মিললে দেশের ডেঙ্গু মোকাবিলায় নতুন একটি হাতিয়ার যুক্ত হতে পারে।
বিশেষ করে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপকে লক্ষ্য করে টিকা তৈরির উদ্যোগ এবং এক ডোজের সম্ভাবনা—দুই কারণেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এখনও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালের ফল, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন—সবকটি ধাপ সফলভাবে পার হলেই টিকাটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য বাজারে আসতে পারবে।
ICMR-এর বক্তব্য অনুযায়ী, সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে ২০২৭ সালের ডেঙ্গুর মরশুম শুরুর আগেই, আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ টিকা বাজারে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে চলতি মরশুমে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তরের নজরদারি অব্যাহত থাকবে। হটস্পটগুলিতে পরীক্ষা বাড়ানো থেকে শুরু করে পুজোর প্যান্ডেলে মশার প্রজননস্থল রোধ—সব দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ, একদিকে এখনই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের লড়াই, অন্যদিকে আগামী বছরের সম্ভাব্য টিকার দিকে তাকিয়ে স্বাস্থ্য মহল। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এই দুই পথই আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।



