দীর্ঘদিনের সংঘাত, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক উত্তেজনার পর আমেরিকা ও ইরানের সম্পর্ক নতুন মোড় নিতে পারে বলে জল্পনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বোঝাপড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, খুব শীঘ্রই সেই সমঝোতা আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প জানান, আলোচনার ফল অত্যন্ত ইতিবাচক হয়েছে এবং উভয় পক্ষ এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আর বেশি সময় লাগবে না। তাঁর কথায়, সপ্তাহান্তের মধ্যেই ইউরোপে কোনও এক বৈঠকে এই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ গত কয়েক মাস ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, তেল পরিবহণের নিরাপত্তা এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বেড়েছিল।
ট্রাম্পের দাবি, সম্ভাব্য সমঝোতার ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে আর কোনও বাধা থাকবে না। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পরিবহণ হয়। ফলে এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরে এলে আন্তর্জাতিক বাজারেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ট্রাম্পের আশাবাদী অবস্থানের বিপরীতে ইরান এখনও অনেক বেশি সতর্ক। তেহরানের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা যাচ্ছে, আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও খসড়া চুক্তির সব শর্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ইরানের আধা সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলিও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইরানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে এখনও একাধিক বিষয় আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে ভাবে সমঝোতাকে প্রায় সম্পন্ন বলে তুলে ধরছেন, তেহরান সেই অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়।
কূটনৈতিক সূত্রের মতে, আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ বাণিজ্যিক চলাচল। এই তিনটি ক্ষেত্রেই উভয় পক্ষ কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত নথিতে কোন শর্তগুলি থাকবে, তা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়ে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। তাঁর মতে, আলোচনার অগ্রগতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে রাজনৈতিক অনুমোদনের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। যদিও এই দাবির পক্ষে ইরানের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশ এই সম্ভাব্য সমঝোতাকে সমর্থন করছে। তাঁর মতে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশও মনে করছেন, যদি এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে ইরানের অবস্থান এখনও অনেকটাই সংযত। দেশটির সরকারি ও আধা সরকারি সূত্রগুলির বক্তব্য, আলোচনার অগ্রগতি মানেই চূড়ান্ত চুক্তি নয়। বরং সব শর্ত খতিয়ে দেখে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রও সম্প্রতি জানিয়েছেন, আলোচনার বেশিরভাগ বিষয় নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। তাঁর অভিযোগ, আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে আমেরিকার অবস্থান একাধিক বার পরিবর্তিত হয়েছে, যা সমঝোতার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরান কোনও অবস্থাতেই নিজের নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে আপস করতে রাজি নয়। জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌম স্বার্থের প্রশ্নে তেহরান আপসহীন অবস্থান বজায় রাখবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কয়েক দিন আগেও ট্রাম্প প্রশাসনের তরফে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি এবং কৌশলগত এলাকা নিয়ে মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছিল। কিন্তু এখন আলোচনার পথে এগোনোর বার্তা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে শুধু আমেরিকা ও ইরানের সম্পর্কেই পরিবর্তন আসবে না, তার প্রভাব পড়বে গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে। তেলের বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পরমাণু কূটনীতির ক্ষেত্রেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেখা যেতে পারে।
তবে আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, আলোচনার টেবিলে তৈরি হওয়া ঐকমত্য শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে রূপ নেয় কি না। কারণ অতীতেও একাধিকবার দুই দেশ সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেও শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে গিয়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ট্রাম্প চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে যতটা আত্মবিশ্বাসী, ইরান ততটাই সতর্ক। সেই দুই অবস্থানের মাঝেই ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সমীকরণ নির্ধারিত হবে।



