দুই চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নিয়েই বড় প্রশ্ন
পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসা করছেন এমন দুই ব্যক্তির মেডিক্যাল যোগ্যতা ও রেজিস্ট্রেশন নিয়ে এবার সরাসরি স্বাস্থ্যদপ্তরের দ্বারস্থ হল প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিং হোম অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের অভিযোগ, শেখ শাহিদুল হক এবং জুলফিকর মণ্ডল নামে দুই চিকিৎসক বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের নথি ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসা করার অনুমতি পেয়েছেন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ব বর্ধমানের সেহরাবাজার নার্সিংহোমের সঙ্গে যুক্ত শেখ শাহিদুল হকের পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন নম্বর WBMC ৮০১৯৮। অন্যদিকে জুলফিকর মণ্ডলের রেজিস্ট্রেশন নম্বর WBMC ৮৯০২১।
সংগঠনের দাবি, দুই চিকিৎসকই বিহার থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের শংসাপত্র দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রেজিস্ট্রেশন নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই শংসাপত্রের সত্যতা নিয়ে বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের রিপোর্টেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে অভিযোগ সংগঠনের।
বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের রিপোর্টই কি বড় প্রমাণ?
অভিযোগের পক্ষে একাধিক নথি স্বাস্থ্যদপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠন। তার মধ্যে রয়েছে বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের রিপোর্ট, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন, নো অবজেকশন সার্টিফিকেট বা NOC এবং পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের পোর্টালে থাকা বিভিন্ন তথ্য।
সংগঠনের বক্তব্য, শুধুমাত্র মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে এই চিঠি দেওয়া হয়নি। দুই চিকিৎসকের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং রেজিস্ট্রেশন যাচাই করার জন্য যে নথি পাওয়া গিয়েছে, সেগুলিই তদন্তের দাবির ভিত্তি।
তবে এই মুহূর্তে অভিযোগগুলি তদন্তাধীন। কোনও আদালত বা সরকারি তদন্তে দুই চিকিৎসককে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
চিকিৎসায় রোগীমৃত্যুর অভিযোগও
ভুয়ো ডিগ্রির অভিযোগের পাশাপাশি আরও গুরুতর দাবি তুলেছে প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিং হোম অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের অভিযোগ, অভিযুক্ত চিকিৎসকদের অধীনে চিকিৎসাধীন থাকা কয়েকজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কথিত যোগসূত্র কী, চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঠিক কোথায় গাফিলতি হয়েছিল এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল—সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
এই কারণেই সংগঠনটি স্বাধীন এবং বিশেষজ্ঞ-স্তরের তদন্তের দাবি জানিয়েছে। চিকিৎসায় গাফিলতি হয়ে থাকলে তার আলাদা করে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছে তারা।
কারও চিকিৎসায় মৃত্যু ঘটলেই যে চিকিৎসকের গাফিলতি প্রমাণিত হয়, তা নয়। তাই রোগীর মৃত্যুর ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে মেডিক্যাল নথি, চিকিৎসা পদ্ধতি, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত—সবকিছু খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
স্বাস্থ্যসাথীর অর্থ নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ
শুধু রোগী দেখা বা চিকিৎসার যোগ্যতা নয়, সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের অর্থ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংগঠনের দাবি, ভুয়ো যোগ্যতা এবং রেজিস্ট্রেশনের ভিত্তিতে ‘স্বাস্থ্যসাথী’-র মতো সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রকল্প থেকে অর্থ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশনের অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরকারি অর্থের অপব্যবহার বা প্রতারণার অভিযোগও সামনে আসতে পারে।
এই কারণে সংগঠনটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্প থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, সেই হিসাব খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে। কোনও অনিয়ম প্রমাণিত হলে সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের কথাও বলা হয়েছে।
পাঁচ দফা দাবিতে স্বাস্থ্যদপ্তরে চিঠি
দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরে পাঠানো চিঠিতে মোট পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিং হোম অ্যাসোসিয়েশন।
প্রথমত, অভিযুক্তদের মেডিক্যাল ডিগ্রি এবং রেজিস্ট্রেশন নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। সেই তদন্ত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে শেষ করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠন।
দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত চিকিৎসকদের চিকিৎসাধীন কোনও রোগীর মৃত্যু বা চিকিৎসাগত গাফিলতির অভিযোগ থাকলে তার স্বাধীন তদন্ত করতে হবে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসাথী বা অন্য কোনও সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্প থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কত টাকা পেয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের কথাও বলা হয়েছে।
চতুর্থত, মেডিক্যাল ডিগ্রি বা রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অবিলম্বে রেজিস্ট্রেশন বাতিল এবং ফৌজদারি মামলা করার দাবি রয়েছে।
পঞ্চমত, ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা যায়, তার জন্য রাজ্যজুড়ে মেডিক্যাল ডিগ্রি ও রেজিস্ট্রেশন যাচাইয়ের একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
সাধারণ মানুষ যাতে অভিযোগ জানাতে পারেন, চাই হেল্পলাইন
সংগঠনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হল, সাধারণ মানুষ এবং চিকিৎসকদের জন্য আলাদা অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা তৈরি করা।
তাদের বক্তব্য, কোনও চিকিৎসকের ডিগ্রি বা রেজিস্ট্রেশন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে সাধারণ মানুষ যাতে সরাসরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য জানাতে পারেন, তার জন্য একটি হেল্পলাইন চালু করা দরকার।
এর ফলে শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, সন্দেহজনক রেজিস্ট্রেশন বা ভুয়ো ডিগ্রির তথ্য দ্রুত যাচাই করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
চিকিৎসাক্ষেত্রে যোগ্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা যত শক্তিশালী হবে, রোগীদের নিরাপত্তাও তত বাড়বে—এমনটাই তাদের যুক্তি।
রাজ্যজুড়ে ভুয়ো চিকিৎসক চক্রের অভিযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একজন চিকিৎসকের ডিগ্রি ভুয়ো হলে তার প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট রোগীর উপর পড়ে না। হাসপাতাল, নার্সিংহোম এবং সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের গোটা ব্যবস্থার উপরই তার প্রভাব পড়তে পারে।
কারণ, একজন চিকিৎসক যদি বৈধ মেডিক্যাল প্রশিক্ষণ ছাড়াই রোগী দেখেন, তাহলে তাঁর দেওয়া চিকিৎসা কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। আবার এমন কেউ সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় পরিষেবা দিলে সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই সংগঠনটি শুধু দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেনি। তারা রাজ্যজুড়ে মেডিক্যাল ডিগ্রি এবং রেজিস্ট্রেশন যাচাইয়ের একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার দাবি তুলেছে।
এখন নজর স্বাস্থ্যদপ্তরের তদন্তে
স্বাস্থ্যদপ্তরের কাছে অভিযোগ পৌঁছনোর পর এখন মূল নজর তদন্তের দিকে। বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের নথি, পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্র যাচাই করাই হতে পারে প্রাথমিক ধাপ।
এর পাশাপাশি তাঁদের চিকিৎসা করা রোগীদের নথি এবং সরকারি স্বাস্থ্য প্রকল্পের মাধ্যমে কোনও আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকলে তার হিসাবও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
অভিযোগগুলি সত্য প্রমাণিত হলে শুধু রেজিস্ট্রেশন বাতিল নয়, ফৌজদারি তদন্তের পথও খুলতে পারে। আবার অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না মিললে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের প্রশ্নও উঠবে না।
সব মিলিয়ে, দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ভুয়ো মেডিক্যাল ডিগ্রি এবং রেজিস্ট্রেশন যাচাই নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংগঠনের দেওয়া নথি এবং অভিযোগ কতটা সত্য, স্বাস্থ্যদপ্তরের তদন্তেই তা স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি রোগীমৃত্যু এবং স্বাস্থ্যসাথীর অর্থ ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতাও তদন্তের পরেই জানা সম্ভব।



