ভারতের ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি নীতি—বিশেষ করে ই-২০ পেট্রল—দেশের ভেতরে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্নের মুখে। মাইলেজ কমে যাওয়া, ইঞ্জিন ক্ষয়ের অভিযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত প্রভাব নিয়ে অটো বিশেষজ্ঞদের একাংশের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। এবার সেই বিতর্কই ছড়িয়ে পড়ল সীমান্তের বাইরে, প্রতিবেশী দেশ ভুটানেও।
সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভারত সম্প্রতি ভুটানকে ই-২০ পেট্রল গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের জ্বালানি বাণিজ্য আরও আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করা, পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু সেই প্রস্তাবেই আপত্তি জানিয়েছে ভুটান। দেশটির অবস্থান, আপাতত তারা ই-২০ নয়, প্রচলিত পেট্রলই আমদানি ও ব্যবহার করবে।
ভুটানের সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, বরং প্রযুক্তিগত এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। হিমালয় ঘেরা ছোট দেশ ভুটানের অধিকাংশ অঞ্চলই পার্বত্য। সেখানে যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্রে দীর্ঘ চড়াই-উতরাই অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। এমন পরিস্থিতিতে ইঞ্জিনের স্থায়িত্ব এবং জ্বালানির কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভুটানের পরিবহন খাতে যুক্ত একাধিক বিশেষজ্ঞের মতে, ই-২০ পেট্রল ব্যবহার করলে গাড়ির মাইলেজ হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড়ি রাস্তায় যেখানে ইতিমধ্যেই জ্বালানি খরচ বেশি, সেখানে অতিরিক্ত মাইলেজ ক্ষতি সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে। এই কারণেই তারা আপাতত প্রচলিত পেট্রলের ওপরই নির্ভর করতে চাইছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। ভুটান মূলত ভারত থেকেই পরিশোধিত পেট্রল আমদানি করে এবং তা ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্কে সংরক্ষণ করে। দেশটির এক জ্বালানি আধিকারিকের বক্তব্য, ইথানল মিশ্রিত পেট্রল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আর্দ্রতা শোষণ ও জল মিশে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে, যা এখনই কার্যকর করা ভুটানের পক্ষে কঠিন।
এই কারণেই ভুটান সরকার ভারতকে জানিয়েছে, বর্তমান অবকাঠামো ও চাহিদার ভিত্তিতে তারা ই-২০ গ্রহণে প্রস্তুত নয়। বরং তারা চায়, অন্তত এখনকার মতো প্রচলিত পেট্রলই সরবরাহ করা হোক।
অন্যদিকে ভারতের তরফে ই-২০ জ্বালানিকে পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারের যুক্তি, ইথানল মিশ্রিত পেট্রল ব্যবহার করলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে। এই নীতি ইতিমধ্যেই দেশের ভেতরে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হচ্ছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে এই নীতির প্রয়োগ নিয়ে বিতর্কও কম নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গাড়ি মালিকদের একাংশ অভিযোগ করছেন, ই-২০ ব্যবহারের পর তাঁদের গাড়ির মাইলেজ আগের তুলনায় কমে গেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের পারফরম্যান্সেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভুটানের মতো একটি প্রতিবেশী দেশের ‘না’ বলাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিকল্প জ্বালানির বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা নিয়েও একটি প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে ভারত-ভুটান সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। জ্বালানি থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ, বাণিজ্য—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা রয়েছে। তাই এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি বিরোধিতা হিসেবে না দেখে, বরং প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের বিষয় হিসেবেই দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
এদিকে ভারতের তরফেও ভুটানের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। জ্বালানি মন্ত্রণালয় চাইছে, ভবিষ্যতে ভুটানের প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন বা বিকল্প সমাধান নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে—সবুজ জ্বালানির পথে অগ্রসর হলেও বাস্তব প্রয়োগে প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক ও প্রযুক্তিগত পরিস্থিতি ভিন্ন। ফলে একক নীতি সব জায়গায় সমানভাবে কার্যকর হবে কি না, সেই প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে ই-২০ বা বিকল্প জ্বালানি নীতি নিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন। বিশেষ করে পার্বত্য বা অবকাঠামোগতভাবে জটিল অঞ্চলে এর প্রভাব কী হতে পারে, তা বিস্তারিতভাবে যাচাই না করলে এই ধরনের দ্বিধা ভবিষ্যতেও দেখা দিতে পারে।



