জোড়া ভূমিকম্পে মুহূর্তে বদলে গেল ভেনেজুয়েলার মানচিত্র
স্থানীয় সময় অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে ভেনেজুয়েলায়। ভূকম্পন এতটাই তীব্র ছিল যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে শহরের পর শহর কেঁপে ওঠে। প্রথম কম্পনের মাত্রা ছিল ৭.২ এবং কিছুক্ষণ পরেই আরও শক্তিশালী ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
ভূগর্ভের অগভীর স্তরে উৎপত্তি হওয়ায় ভূমিকম্পের প্রভাব আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হয়েছে বলে ভূ-বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা। ক্যারিবীয় উপকূল সংলগ্ন অঞ্চলের কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল হওয়ায় উপকূলীয় শহরগুলিতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
কারাকাস-সহ একাধিক শহর ধ্বংসস্তূপে
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস এখন কার্যত বিপর্যস্ত নগরীতে পরিণত। বহু বহুতল ভবন হেলে পড়েছে, কিছু সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। রাস্তা জুড়ে ফাটল, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, জল সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বহু এলাকায়।
শুধু রাজধানী নয়, আশপাশের ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বহু জায়গায় রাস্তা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারছে না। ফলে স্থানীয় মানুষই নিজেরা হাত লাগিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন।
মৃতের সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত, উদ্বেগে প্রশাসন
সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যে ৯২০ ছাড়িয়েছে। তবে ধ্বংসস্তূপের গভীরে এখনও বহু মানুষ আটকে থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আহতের সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি এবং অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বিভিন্ন হাসপাতাল আহতদের চাপে ভরে উঠেছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে খবর। জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদনও জানানো হয়েছে।
উদ্ধারকাজ নিয়ে ক্ষোভ—সোচ্চার সাধারণ মানুষ
ভূমিকম্পের পর থেকেই উদ্ধারকাজ শুরু হলেও গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী দল না পৌঁছনোয় স্থানীয় মানুষ নিজেরাই হাত দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন।
কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে, সাধারণ নাগরিকরাই একত্রিত হয়ে চাপা পড়া মানুষদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। কেউ হাত দিয়ে ইট সরাচ্ছেন, কেউ আবার জেনারেটর ও আলো জোগাড় করে রাতেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
একাধিক পরিবারের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেক জায়গায় উদ্ধার সরঞ্জাম পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, ফলে জীবনহানির সংখ্যা আরও বাড়ছে।
প্রিয়জনের খোঁজে অসহায় পরিবার
ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বহু মানুষ। কেউ সন্তানকে খুঁজছেন, কেউ বাবা-মাকে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য ছবি ও ভিডিও, যেখানে মানুষজন হাত দিয়ে পাথর সরিয়ে প্রিয়জনের খোঁজ করছেন।
এক মা জানিয়েছেন, তাঁর দুই মেয়ে ভবনের ভিতরে আটকে থাকতে পারেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। আরেক তরুণী জানান, ভাইয়ের সন্ধানে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের সামনে অপেক্ষা করছেন।
এই মানবিক বিপর্যয় গোটা দেশকে শোকস্তব্ধ করে দিয়েছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থা ও অবকাঠামো বিপর্যস্ত
ভূমিকম্পে ভেঙে পড়েছে বহু হাসপাতাল ভবনও। কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র অস্থায়ীভাবে খোলা জায়গায় কাজ চালাচ্ছে। আহতদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও কাজ করছে না, ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন।
আন্তর্জাতিক সাহায্যের আর্জি
ভেনেজুয়েলা সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জরুরি সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে। উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
একাধিক প্রতিবেশী দেশ ইতিমধ্যে সহায়তার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ
ভূ-বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, একই অঞ্চলে আরও পরাঘাত (aftershock) হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলিতে আরও বিপদ বাড়তে পারে।
এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করা এবং আহতদের চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করা।
ভেনেজুয়েলার এই ভয়াবহ ভূমিকম্প শুধু একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং মানবিক সংকটেও পরিণত হয়েছে। মৃতের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে মানুষের আর্তনাদ ও ক্ষোভ। উদ্ধারকাজের গতি দ্রুত না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।



