দিল্লিতে শুরু হচ্ছে অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলন
শনিবার থেকে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে শুরু হচ্ছে চলতি বছরের ব্রিকস সম্মেলন। দু’দিনের এই বৈঠকে বিশ্বের একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
ব্রিকসের মঞ্চে অর্থনীতি, বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক নানা সংকট নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু এবারের সম্মেলনের গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা এবং বড় শক্তিগুলির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে দিল্লির বৈঠক থেকে আন্তর্জাতিক মহল কী বার্তা পায়, সেদিকেই নজর থাকবে।
এক মঞ্চে পুতিন, জিনপিং ও পেজেশকিয়ান
এবারের ব্রিকস সম্মেলনের অন্যতম বড় আকর্ষণ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের উপস্থিতি।
পুতিন ইতিমধ্যেই শুক্রবার ভারতে পৌঁছে গিয়েছেন। ব্রিকসের মূল সম্মেলনের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়েও তাঁর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, গালওয়ান সংঘাতের পর এই প্রথম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে আসছেন শি জিনপিং। ভারত-চিন সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে তাঁর দিল্লি সফর স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের উপস্থিতিও এবারের সম্মেলনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের আবহে তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বের দিল্লি সফর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ছায়া
এবারের ব্রিকস সম্মেলন এমন একটি সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলির অবস্থান এই সংঘাতের ক্ষেত্রে এক নয়। ফলে ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চে যুদ্ধ, শান্তি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে। যদিও সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে কোন বিষয় কতটা গুরুত্ব পাবে, তা বৈঠকের পরই স্পষ্ট হবে।
মোদির বার্তা, ‘বিশ্বের কল্যাণ’ হোক আলোচনার কেন্দ্রে
ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগে শুক্রবার সমাজমাধ্যমে নিজের বার্তা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
তিনি জানান, আগামী কয়েকদিন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাষ্ট্রপ্রধানরা ব্রিকস সম্মেলনে একত্রিত হবেন। তাঁর আশা, সম্মেলনে বিভিন্ন বিষয়ে গঠনমূলক ও অর্থবহ আলোচনা হবে এবং বিশ্বকল্যাণের বিষয়টিও সেই আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
মোদির এই বার্তাকে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ যুদ্ধ, বাণিজ্যিক সংঘাত এবং ভূরাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে ভারত নিজেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও আলোচনাভিত্তিক অবস্থানে তুলে ধরতে চাইছে।
ভারত-চিন-রাশিয়া সমীকরণে নজর
ব্রিকসের এবারের সম্মেলনে ভারত, চিন ও রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে।
ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে চিনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও বহুপাক্ষিক মঞ্চে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে।
এই পরিস্থিতিতে মোদি, পুতিন ও জিনপিংয়ের একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মধ্যে পৃথক বা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হলে তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মতো বিষয় নিয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে কোনও বার্তা আদানপ্রদান হয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।
আমেরিকার নীতির প্রভাবও আলোচনায়
এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতি।
শুল্কনীতি, বাণিজ্যিক চাপ এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার দেশগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা নতুন গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করার বিষয়ে ব্রিকসের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে ভারত একইসঙ্গে আমেরিকা এবং পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখে। ফলে দিল্লির নীতির ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।
পুতিনের ভারত সফরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও গুরুত্বপূর্ণ
ব্রিকস সম্মেলনের আগে শুক্রবারই ভারতে পৌঁছেছেন পুতিন। তাঁর এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক।
ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ রয়েছে।
ব্রিকস মঞ্চের বাইরে দুই নেতার বৈঠক তাই সম্মেলনের কূটনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
জিনপিংয়ের সফরেও বাড়তি গুরুত্ব
শি জিনপিংয়ের ভারত সফরও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ভারত ও চিনের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্রিকসের মঞ্চে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য নতুন কোনও সুযোগ তৈরি করে কি না, সেটাই দেখার।
যদিও ব্রিকস মূলত বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মঞ্চ, তবুও এই ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে রাষ্ট্রপ্রধানদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
পেজেশকিয়ানের উপস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আগ্রহ
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের উপস্থিতি এবারের সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারে।
ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলির সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। তার উপর সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এই পরিস্থিতিতে দিল্লিতে ইরানের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত একইসঙ্গে ইরান, রাশিয়া, পশ্চিমা দেশ এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে।
ফলে ব্রিকস সম্মেলনে ভারত কীভাবে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতার বার্তা তুলে ধরে, সেদিকেও নজর থাকবে।
‘বিশ্বকল্যাণ’-এর বার্তা কতটা বাস্তবায়িত হবে?
প্রধানমন্ত্রীর বার্তায় ইতিবাচক ও অর্থবহ আলোচনার পাশাপাশি বিশ্বকল্যাণের কথা উঠে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ব্রিকস কি সত্যিই বড় কোনও বৈশ্বিক সংকটের সমাধানের পথ দেখাতে পারবে?
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। অর্থনৈতিক স্বার্থও অনেক ক্ষেত্রে আলাদা। ফলে একটি অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছনো সহজ নয়।
তবু এই ধরনের মঞ্চে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির মধ্যে অবিশ্বাস ও সংঘাত বাড়ছে, তখন বহুপাক্ষিক আলোচনার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক উত্তেজনার আবহে দিল্লিতে শুরু হতে চলা অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। পুতিন, জিনপিং ও পেজেশকিয়ানের উপস্থিতি সম্মেলনের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যেই ইতিবাচক ও অর্থবহ আলোচনার বার্তা দিয়েছেন। এখন দেখার, ভারত মণ্ডপমের বৈঠক থেকে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংঘাত পরিস্থিতি নিয়ে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বেরিয়ে আসে কি না।



