বর্ষা এখনও পুরোপুরি জমে ওঠেনি, তার আগেই উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জেলাগুলিতে শুরু হয়েছে প্রকৃতির রুদ্ররূপ। গত কয়েকদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টির জেরে দার্জিলিং, কালিম্পং এবং সিকিম-সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়ায় একাধিক জায়গায় ধস নামে এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে দার্জিলিং-শিলিগুড়ি সংযোগকারী ১১০ নম্বর জাতীয় সড়কে। কুর্সিয়ং-সহ একাধিক এলাকায় পাহাড়ি ধস নেমে রাস্তার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে আপাতত ওই রুটে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। প্রশাসনের তরফে ধস সরিয়ে রাস্তা দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও অব্যাহত বৃষ্টির কারণে উদ্ধারকারী দলগুলিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে।
প্রবল বর্ষণের জেরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন নদীর জলস্তরও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বালাসন, মহানন্দা এবং তিস্তা নদীর জল বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় নদীতীরবর্তী এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে বালাসন নদীর জলের তোড়ে দুধিয়া এলাকার অস্থায়ী সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সেতুটি স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। সেতুর ক্ষয়ক্ষতির ফলে আশপাশের এলাকার মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েকটি পাহাড়ি এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। বৃষ্টির কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকাগুলিতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে প্রশাসনকে বিশেষ নজর দিতে হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গে পর্যটনের মরশুম শুরু হওয়ার মুখে এই দুর্যোগ নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রাথমিকভাবে খবর মিলেছে, কয়েকটি জায়গায় পর্যটকরা আটকে পড়েছেন। যদিও প্রশাসনের দাবি, পরিস্থিতির উপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে এবং পর্যটকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগকে সতর্ক রাখা হয়েছে। যেসব এলাকায় ধস নেমেছে, সেখানে দ্রুত উদ্ধারকারী দল পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের বিপজ্জনক এলাকা থেকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে দুটি জরুরি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। যে কোনও ধরনের সাহায্য বা তথ্যের জন্য ১৮০০-২১২১-৬৫৫ এবং ০৩৫৩-২৫১৩৯৮৬ নম্বরে যোগাযোগ করার আবেদন জানিয়েছে প্রশাসন।
গত বছরের অক্টোবরেও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাক্ষী ছিল উত্তরবঙ্গ। অতিবৃষ্টির জেরে বহু রাস্তা ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছিল। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে মেরামতির কাজ চালিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ফের বর্ষার শুরুতেই একই ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা সামনে চলে আসায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টির ফলে মাটির জলধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। পাশাপাশি সিকিম ও ভুটানের উজান এলাকা থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত জল উত্তরবঙ্গের নদীগুলির উপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আগামী কয়েকদিন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর রয়েছে প্রশাসন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেছেন। বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে উদ্ধার ও ত্রাণ সংক্রান্ত পদক্ষেপের অগ্রগতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পাহাড়ে অবস্থানরত পর্যটকদের অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে নিরাপদ জায়গায় থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আপাতত বৃষ্টি থামার কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত না থাকায় উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলে সতর্কতা অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রশাসনের আশা, আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হলেই ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করার কাজ আরও জোরদার করা সম্ভব হবে। তবে আপাতত পাহাড়ের মানুষ এবং পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে টানা বর্ষণের এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।



