দলীয় প্রতীক, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি ঘিরে তৃণমূলের দুই শিবিরের টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়ে উঠল। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কমিশনের সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি যেন স্বচ্ছ ও পক্ষপাতহীনভাবে পরিচালিত হয় এবং কোনও পক্ষকে অতিরিক্ত সুযোগ বা সময় না দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই চিঠির মাধ্যমে কমিশনের উপর নৈতিক চাপ তৈরি করতে চাইছে কালীঘাট শিবির। কারণ, দলীয় প্রতীক এবং সংগঠনের বৈধতা নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, তাঁদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। সেই নথির ভিত্তিতেই তদন্ত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এগোনো উচিত বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, প্রতিপক্ষ শিবিরকে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হলে তা নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলে দিতে পারে।
বিতর্কের সূত্রপাত কমিশনের নির্ধারিত সময়সীমা ঘিরে। দলীয় সূত্রে দাবি, উভয় পক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজেদের দাবি-সংক্রান্ত নথি জমা দিতে বলা হয়েছিল। কালীঘাট শিবির সেই সময়সীমা মেনে নথি জমা দিলেও, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির অতিরিক্ত সময় চায়। অভিযোগ, সেই আবেদন মঞ্জুর করে কমিশন আরও ১৫ দিনের সময় দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়েই আপত্তি তুলেছে কালীঘাট শিবির। তাদের বক্তব্য, একই মামলায় এক পক্ষকে বাড়তি সময় দেওয়া হলে সমতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
সোমবার দিল্লিতে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে এই অভিযোগ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেন দলের সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং সাগরিকা ঘোষ। তাঁদের বক্তব্য, কমিশনের কাছে জমা দেওয়া নথি এবং তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেন, তাঁদের পক্ষ এখনও প্রতিপক্ষের জবাব হাতে না পেলেও, নিজেদের জমা দেওয়া নথি কীভাবে অন্য শিবিরের কাছে পৌঁছে গেল, সেই বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
একই বৈঠকে সাগরিকা ঘোষ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকেই বেশি করে নিশানা করা হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির অভিযোগগুলি উড়িয়ে দিয়েছে। তাঁদের দাবি, কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী আইনজীবীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে কমিশন যদি আরও কোনও তথ্য বা ব্যাখ্যা চায়, তাও একই পদ্ধতিতে জমা দেওয়া হবে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, কমিশনের সমস্ত নির্দেশ তাঁরা মেনে চলছেন এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ার উপর তাঁদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তাই কমিশনের কাছে প্রয়োজনীয় সব নথি যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়া হবে।
এই বিরোধের পেছনে রয়েছে দলীয় প্রতীক এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা দীর্ঘ আইনি ও সাংগঠনিক লড়াই। সম্প্রতি আলিপুর আদালতের এক রায়ে ঋতব্রত শিবিরের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আসে। সেই রায়ের অনুলিপিও নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তাদের আইনজীবী দল।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আদালতের রায় কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। কারণ নির্বাচন কমিশন সাধারণত নিজস্ব বিধি, সাংগঠনিক নথি এবং সদস্যসংখ্যার মতো একাধিক বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
এই পরিস্থিতিতে উভয় শিবিরই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে আইনি ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। একদিকে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জনমত গঠনের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্রিয় রয়েছে প্রতিপক্ষ।
আগামী কয়েক সপ্তাহে কমিশনের কাছে জমা পড়া নথি, শুনানি এবং আইনি যুক্তির ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দলীয় প্রতীক, সাংগঠনিক স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভবিষ্যৎ।
রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই বিতর্ক ইতিমধ্যেই বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল ও দুই শিবিরের সমর্থকদের।



