নন্দীগ্রাম-রেজিনগরে জোটের প্রস্তাব কেন?
৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন। মনোনয়ন পর্ব শেষ হওয়ার আগে দুই কেন্দ্রে কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে আসন সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল।
দ্য স্টেটসম্যানের রিপোর্ট অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপালের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দুই আসনে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রস্তাবিত সমীকরণে নন্দীগ্রামে কংগ্রেসকে জায়গা করে দেওয়ার বিনিময়ে রেজিনগরে কংগ্রেসের সমর্থন চাওয়া হয়েছিল বলে ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
তবে কংগ্রেসের তরফে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। কংগ্রেস সূত্রের বক্তব্য, বাংলায় তৃণমূলের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কের অতীত এবং স্থানীয় স্তরে দলের কর্মীদের আপত্তির বিষয়টি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ফলে শেষ পর্যন্ত দুই দলই নিজেদের প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনী ময়দানে থাকছে।
কংগ্রেসের ‘না’, তৃণমূলের পালটা বার্তা
জোটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর তৃণমূলের তরফে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। দলের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, কংগ্রেস যদি রাজ্যের স্থানীয় নেতৃত্বের অবস্থানকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়, তাহলে সংসদের ভিতরেও তৃণমূলের পক্ষে কংগ্রেসের সঙ্গে সব বিষয়ে সমন্বয় বজায় রাখার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
অর্থাৎ, বাংলার উপনির্বাচনে দুই দলের দূরত্বের প্রভাব জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও পড়তে পারে—এমন বার্তাই তৃণমূলের তরফে দেওয়া হয়েছে।
তবে এই বক্তব্যকে তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক ভবিষ্যৎ নীতি হিসেবে দেখার আগে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের লিখিত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
কংগ্রেসের পালটা অবস্থান কী?
কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকার অবশ্য বৃহত্তর জোটের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করার কথা বলেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তৃণমূল যদি সত্যিই সমঝোতা চায়, তাহলে প্রথমে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে কংগ্রেস প্রার্থীদের সমর্থন করা উচিত।
এর পর ভবিষ্যতের অন্যান্য রাজনৈতিক লড়াই নিয়ে দুই দলের মধ্যে আলোচনা হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাৎ দুই দলের বক্তব্যে এই মুহূর্তে মূল পার্থক্য হল—কে আগে কাকে সমর্থন করবে এবং কোন শর্তে সমঝোতা হবে।
এই অবস্থান থেকেই স্পষ্ট, উপনির্বাচনের সমীকরণ শুধু বিজেপিকে কেন্দ্র করে নয়; কংগ্রেস ও তৃণমূলের পারস্পরিক সম্পর্কও ভোটের আগে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
দুই দলই নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে
কংগ্রেস ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রামে মিলন প্রধান এবং রেজিনগরে মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফিকে প্রার্থী করেছে। ১১ সেপ্টেম্বর কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই দুই প্রার্থীর নাম অনুমোদন করে।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দে এবং রেজিনগরে রাবিউল আলম চৌধুরীকে প্রার্থী করেছে। ১৩ সেপ্টেম্বর দুই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়।
ফলে জোটের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও বাস্তবে দুই দলের প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রস্তুতিতে নেমে পড়েছেন।
নন্দীগ্রামে লড়াইয়ের আলাদা গুরুত্ব
নন্দীগ্রাম কেন্দ্রটি এমনিতেই বাংলার রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর—দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছিলেন। পরে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভবানীপুরকে নিজের বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নন্দীগ্রাম আসনটি খালি হয় এবং উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
এই কেন্দ্রে বিজেপি প্রয়াত চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে প্রার্থী করেছে। ফলে তৃণমূল ও কংগ্রেসের পাশাপাশি বিজেপির প্রার্থীকেও ঘিরে আলাদা রাজনৈতিক প্রচার শুরু হয়েছে।
নন্দীগ্রামে তাই শুধু একটি উপনির্বাচন নয়, একাধিক রাজনৈতিক শক্তির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে।
রেজিনগরেও একই ছবি
রেজিনগর আসনটিও উপনির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হুমায়ুন কবীর রেজিনগর এবং নওদা—দুই আসন থেকে জয়ী হয়েছিলেন। পরে রেজিনগর আসন ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
এই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী রাবিউল আলম চৌধুরী এবং কংগ্রেসের প্রার্থী মহম্মদ আবদুল্লাহিল কাফি। বিজেপিও শাখারফ সরকারকে প্রার্থী করেছে। ফলে এখানেও একাধিক দলের সরাসরি লড়াই হচ্ছে।
তৃণমূলের অন্দরেও নতুন সমীকরণ
এই উপনির্বাচনে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীও নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
নন্দীগ্রামে মহম্মদ এতেসামুল হক এবং রেজিনগরে সফিউজ্জামান শেখকে প্রার্থী করা হয়েছে বলে রিপোর্ট রয়েছে।
ফলে দুই কেন্দ্রে মমতা-নেতৃত্বাধীন তৃণমূল ও কংগ্রেসের পৃথক লড়াইয়ের পাশাপাশি তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নির্বাচনী অঙ্ককে আরও জটিল করেছে।
জোটের প্রশ্নে কেন এতটা গুরুত্ব?
বাংলায় কংগ্রেস ও তৃণমূলের সম্পর্ক বরাবরই ওঠানামার মধ্যে থেকেছে। জাতীয় স্তরে বিরোধী দলগুলির সমন্বয়ের প্রশ্ন থাকলেও রাজ্যে দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট বিভাজন কমানোর জন্য আসন সমঝোতার আলোচনা হয়েছিল বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে। কিন্তু সেই আলোচনা সফল না হওয়ায় দুই দলই নিজেদের সংগঠন এবং প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনে নামছে।
এখন প্রশ্ন হল, উপনির্বাচনের ফলাফল ভবিষ্যতে দুই দলের সম্পর্ককে আরও দূরে নিয়ে যাবে, নাকি নির্বাচনের পর নতুন করে আলোচনার জায়গা তৈরি হবে।
সংসদে সম্পর্কের উপরও প্রভাব পড়বে?
তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। তবে সংসদে কোনও নির্দিষ্ট ইস্যুতে দুই দল ভবিষ্যতে একসঙ্গে ভোট দেবে কি না, তা প্রতিটি বিল ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করতে পারে।
জাতীয় স্তরে কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে সহযোগিতা এবং মতপার্থক্য—দুই-ই আগে দেখা গিয়েছে। তাই উপনির্বাচনে জোট না হওয়াকে সংসদীয় সমন্বয়ের স্থায়ী অবসান হিসেবে এখনই চূড়ান্তভাবে ধরে নেওয়া যায় না।
বরং নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের বর্তমান অবস্থান কীভাবে এগোয়, সেটিই পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
৬ অক্টোবর ভোট, ফল ৯ অক্টোবর
নির্বাচন কমিশনের সূচি অনুযায়ী নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে ভোট হবে ৬ অক্টোবর। মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৭ সেপ্টেম্বর হবে মনোনয়নপত্রের যাচাই এবং ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। ভোটগণনা হবে ৯ অক্টোবর।
অর্থাৎ এখন মূল লড়াই প্রচারপর্বে। কংগ্রেস-তৃণমূলের আলাদা প্রার্থী, বিজেপির প্রার্থী এবং তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উপস্থিতিতে দুই কেন্দ্রেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহুমুখী হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে জোটের আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দুই দল নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক কতটা ধরে রাখতে পারে এবং নির্বাচনী প্রচারে কী বার্তা দেয়, সেদিকেই নজর থাকবে।



