তাসখন্দে মোদিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা শাভকাতের
শনিবার দু’দিনের উজবেকিস্তান সফরে তাসখন্দে পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়য়েভ।
দুই নেতার সাক্ষাতের মুহূর্তে উষ্ণতার ছবি সামনে আসে। শাভকাত নিজে মোদিকে স্বাগত জানান এবং তাঁকে আলিঙ্গন করেন। এরপর আরও একটি দৃশ্য নজর কাড়ে—প্রোটোকলের গণ্ডি পেরিয়ে মোদিকে নিজের গাড়িতে নিয়ে গন্তব্যের দিকে রওনা দেন উজবেক প্রেসিডেন্ট।
দুই রাষ্ট্রনেতার একই গাড়িতে যাত্রার ছবি দ্রুত সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এমন ব্যক্তিগত উষ্ণতা দুই দেশের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি মোদি ও শাভকাতের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। সেখানে ভারত ও উজবেকিস্তানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ নিয়ে মতবিনিময় হওয়ার কথা।
মধ্য এশিয়ায় ভারতের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও উজবেকিস্তানের গুরুত্ব যথেষ্ট। ফলে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার জন্য নতুন উদ্যোগের সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়
বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও মোদি-শাভকাত বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
মধ্য এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। সন্ত্রাস দমন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
ভারতের কাছে মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক জোরদার করা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উজবেকিস্তানও এই অঞ্চলে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
জ্বালানি ও ডিজিটাল সংযোগে জোর
জ্বালানি ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। উজবেকিস্তানের জ্বালানি সম্পদ এবং ভারতের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদার প্রেক্ষিতে এই খাত নিয়ে আলোচনার গুরুত্ব রয়েছে।
এর পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সংযোগ ব্যবস্থার বিষয়টিও বৈঠকে জায়গা পেতে পারে। ডিজিটাল পরিকাঠামো, প্রযুক্তি বিনিময় এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ খতিয়ে দেখা হতে পারে।
শাস্ত্রী মেমোরিয়াল ও গান্ধী সেন্টারে যাবেন মোদি
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পাশাপাশি তাসখন্দে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
মোদি তাসখন্দের শাস্ত্রী মেমোরিয়ালে শ্রদ্ধা জানাবেন। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্মৃতিও এর সঙ্গে জড়িত।
এর পাশাপাশি তাসখন্দ স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের মহাত্মা গান্ধী সেন্টার পরিদর্শন করবেন তিনি। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ভারত-উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের দিকটিও সামনে আসবে।
চতুর্থবার উজবেকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি মোদির চতুর্থ উজবেকিস্তান সফর। এর আগে ২০২২ সালে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি তাসখন্দ সফর করেছিলেন।
এবারের সফরের লক্ষ্য শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, মধ্য এশিয়ায় ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করা। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মধ্য এশিয়ার গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
উজবেকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা এবং প্রযুক্তির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে।
উজবেকিস্তানের পর কিরগিজস্তান
উজবেকিস্তানে দু’দিনের কর্মসূচি শেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিরগিজস্তানের উদ্দেশে রওনা দেবেন।
সেখানে তিনি ২৬তম সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন। ফলে সফরের দ্বিতীয় পর্যায়েও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
এসসিও মঞ্চে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, যোগাযোগ এবং সদস্য দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, মোদির উজবেকিস্তান সফরে একদিকে যেমন শাভকাত মিরজিয়য়েভের সঙ্গে ব্যক্তিগত উষ্ণতার ছবি সামনে এসেছে, তেমনই দুই দেশের সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাসখন্দের বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, ডিজিটাল সংযোগ ও শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতার পথ কতটা খুলে যায়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।



