কেন ধর্মঘটে ব্যাঙ্ক অফিসাররা?
ব্যাঙ্ক অফিসারদের সংগঠন ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক অফিসার্স কনফেডারেশন বা এআইবিওসি-র দাবি, সপ্তাহে পাঁচদিন কর্মদিবস চালুর প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়িত হয়নি।
সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক শুভজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বেতন সংশোধনের সময় পাঁচদিনের কর্মদিবস চালুর বিষয়ে লিখিত চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির পর প্রায় আড়াই বছর কেটে গেলেও সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।
ব্যাঙ্ক অফিসারদের অভিযোগ, প্রতিবারই আইনি জটিলতার কথা বলে বিষয়টি পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর এবার আন্দোলনের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংগঠনের বক্তব্য, সপ্তাহে পাঁচদিন কাজের ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চালু রয়েছে। ব্যাঙ্কিং পরিষেবার ক্ষেত্রেও কর্মীদের দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবায়ন করা উচিত।
শুক্রবার থেকেই শুরু ধর্মঘট
শুক্রবার সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মঘটের প্রভাব পড়তে শুরু করে। একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখায় স্বাভাবিক পরিষেবা ব্যাহত হয়। কিছু জায়গায় কর্মী ও অফিসাররা ব্যাঙ্কের সামনে অবস্থান-বিক্ষোভে সামিল হন।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও ধর্মঘটকে ঘিরে বিক্ষোভের ছবি সামনে এসেছে। আসানসোলে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার কর্মী ও অফিসারদের একাংশ পাঁচদিনের কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেন।
ব্যাঙ্কের শাখাগুলিতে পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় গ্রাহকদের অনেকেই সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে যাঁদের জরুরি নগদ লেনদেন, চেক সংক্রান্ত কাজ বা শাখাভিত্তিক পরিষেবার প্রয়োজন ছিল, তাঁদের ভোগান্তি বাড়ে।
দ্বিতীয় শনিবার ও রবিবার, তাই টানা তিনদিন পরিষেবা বন্ধ
শুক্রবারের ধর্মঘটের পর শনিবার দ্বিতীয় শনিবার হওয়ায় ব্যাঙ্কের শাখা এমনিতেই বন্ধ থাকবে। তার পরের দিন রবিবার।
ফলে একদিনের ধর্মঘট কার্যত পরপর তিনদিন ব্যাঙ্কের শাখাভিত্তিক পরিষেবা থেকে গ্রাহকদের দূরে রাখছে। পুজোর আগে এই সময়েই বহু মানুষ কেনাকাটা, ভ্রমণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য ব্যাঙ্কিং পরিষেবার উপর নির্ভর করেন।
ফলে এটিএম ও ডিজিটাল ব্যাঙ্কিংয়ের উপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার থেকেই বিভিন্ন জায়গায় এটিএমের সামনে গ্রাহকদের লাইন দেখা যায় বলে জানা গিয়েছে।
তবে ধর্মঘটের প্রভাব মূলত শাখাভিত্তিক পরিষেবায় পড়লেও এটিএম, অনলাইন ব্যাঙ্কিং, ইউপিআই বা অন্যান্য ডিজিটাল পরিষেবা একইভাবে বন্ধ থাকবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পরিষেবাভেদে প্রভাব আলাদা হতে পারে।
এটিএমের সামনে দীর্ঘ লাইন
ব্যাঙ্কের শাখা বন্ধ থাকায় নগদ টাকার প্রয়োজন মেটাতে অনেক গ্রাহক এটিএমের দিকে ছুটেছেন। কোথাও কোথাও এটিএমের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা গিয়েছে বহু মানুষকে।
পুজোর আগে সাধারণত বাজার-হাট এবং কেনাকাটার খরচ বেড়ে যায়। ফলে হাতে নগদ রাখার প্রয়োজনও অনেকের থাকে। এই সময়েই পরপর কয়েকদিন শাখা বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যদিও এটিএম পরিষেবা ধর্মঘটের কারণে সর্বত্র বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে কোনও নির্দিষ্ট এটিএমে নগদ শেষ হয়ে গেলে কাছাকাছি অন্য এটিএমে গ্রাহকদের ভিড় বাড়তে পারে।
শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক নয়, বেসরকারি ব্যাঙ্কেও প্রভাব
এই ধর্মঘটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, আন্দোলনকারী সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অফিসাররাই নেই।
এআইবিওসি-র সঙ্গে যুক্ত বহু বেসরকারি ব্যাঙ্কের অফিসারও রয়েছেন বলে সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে। ফলে ধর্মঘটের প্রভাব শুধুমাত্র সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
তবে কোন ব্যাঙ্কের কোন শাখায় কতটা পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে, তার মাত্রা অঞ্চল ও শাখাভেদে আলাদা হতে পারে।
গ্রাহকদের ক্ষেত্রে তাই জরুরি কাজ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কের ডিজিটাল পরিষেবা বা নির্দিষ্ট শাখার পরিষেবা পরিস্থিতি আগে যাচাই করে নেওয়াই নিরাপদ।
সেপ্টেম্বরে ফের তিনদিনের ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি
শুক্রবারের ধর্মঘটকে সংগঠনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এআইবিওসি জানিয়েছে, সরকার দ্রুত পাঁচদিনের কর্মদিবস চালু না করলে আগামী ২৮, ২৯ এবং ৩০ সেপ্টেম্বর টানা তিনদিন ধর্মঘটে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেই ফের বড় ধরনের পরিষেবা বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যাঙ্ক অফিসারদের দাবি, আজকের ধর্মঘটের পরও যদি সরকারের তরফে কোনও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না আসে, তাহলে আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ আরও কঠোর হতে পারে।
অক্টোবর থেকে লাগাতার ধর্মঘটের হুমকি
শুধু সেপ্টেম্বরের তিনদিনের ধর্মঘটেই আন্দোলন থামবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠন।
এআইবিওসি-র বক্তব্য, ২৮ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির পরও যদি পাঁচদিনের কর্মদিবসের দাবি পূরণ না হয়, তাহলে ২৬ অক্টোবর থেকে লাগাতার ধর্মঘটে যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
এমনটা হলে ব্যাঙ্কিং পরিষেবায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে উৎসবের মরশুমে সাধারণ গ্রাহক, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সংস্থার নিয়মিত লেনদেনও সমস্যার মুখে পড়তে পারে।
তবে লাগাতার ধর্মঘটের চূড়ান্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় এবং সরকার ও ব্যাঙ্কিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংগঠনের আলোচনায় কোনও সমাধান বের হয় কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
পুজোর আগে কেন বাড়ছে উদ্বেগ?
দুর্গাপুজোর আগে ব্যাঙ্কিং পরিষেবার চাহিদা সাধারণত বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের লেনদেন, কর্মীদের বেতন, কেনাকাটার খরচ, বিভিন্ন বিল এবং উৎসবের প্রস্তুতি—সব ক্ষেত্রেই ব্যাঙ্কিং পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ।
এই সময়েই টানা কয়েকদিন শাখা বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে গ্রামীণ ও ছোট শহরগুলিতে যেখানে এখনও বহু মানুষ শাখাভিত্তিক ব্যাঙ্কিং পরিষেবার উপর নির্ভর করেন, সেখানে সমস্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়লেও সব ধরনের ব্যাঙ্কিং কাজ অনলাইনে করা সম্ভব নয়। ফলে শাখায় গিয়ে করতে হয় এমন পরিষেবার ক্ষেত্রে অপেক্ষা বাড়তে পারে।
সরকারের সিদ্ধান্তের দিকেই নজর
ব্যাঙ্ক অফিসারদের সংগঠন ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, দীর্ঘদিনের দাবি আর পিছিয়ে রাখতে রাজি নয় তারা। লিখিত চুক্তি হওয়ার পরও সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়াই তাঁদের ক্ষোভের মূল কারণ।
এখন প্রশ্ন, সরকারের তরফে পাঁচদিনের কর্মদিবস নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয় কি না। আলোচনা শুরু হলে সেপ্টেম্বরে ঘোষিত তিনদিনের ধর্মঘট এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
অন্যথায় পুজোর মরশুমেই ব্যাঙ্কিং পরিষেবা নিয়ে আরও বড় সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, সপ্তাহে পাঁচদিন ব্যাঙ্ক খোলার দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। শুক্রবারের ধর্মঘটের সঙ্গে দ্বিতীয় শনিবার ও রবিবার যুক্ত হওয়ায় গ্রাহকদের জন্য টানা তিনদিন শাখাভিত্তিক পরিষেবা বন্ধ থাকছে। জেলায় জেলায় বিক্ষোভ এবং এটিএমে ভিড় পরিস্থিতির প্রভাব স্পষ্ট করেছে। এর পরেও দাবি পূরণ না হলে ২৮, ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর ফের ধর্মঘট এবং ২৬ অক্টোবর থেকে লাগাতার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে এআইবিওসি। ফলে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর।



