তদন্তকারীদের সূত্র অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন ব্যবস্থার ভেতরে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তুলেছিলেন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিযোগ, কোনো বড় নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট নথি প্রথমে তাঁর কাছেই পৌঁছত এবং সেখানেই নির্ধারিত হত প্রকল্পটি অনুমোদন পাবে কি না, বা কত তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা যাবে।
সূত্রের দাবি, তিনি সরাসরি ডেভেলপার ও রিয়েল এস্টেট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং ‘ডিল’ ফাইনাল করার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করতেন। পুরসভা অফিসের মধ্যেই এই আলোচনার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হত বলে অভিযোগ। তদন্তে উঠে এসেছে, অর্থ লেনদেনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু মাধ্যমও ব্যবহার করা হত, যাদের মাধ্যমে ঘুষের টাকা সংগ্রহ করা হত।
তদন্তে আরও জানা যাচ্ছে, শুধু প্ল্যান অনুমোদন নয়, পুরসভার বিভিন্ন বিভাগীয় বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও তাঁর প্রভাব ছিল। অভিযোগ, কোন কর্মকর্তা কোথায় কাজ করবেন, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশেই নির্ধারিত হত।
পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, লাইসেন্সিং ব্রাঞ্চ এবং বিল্ডিং সেকশনের মধ্যে একটি সমন্বিত ‘চেইন’ তৈরি হয়েছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের। এই চেইনের মাধ্যমে নথি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দ্রুত সরানো বা আটকে দেওয়ার কাজ চলত।
অভিযোগ অনুযায়ী, যে প্রকল্পে যত বেশি আর্থিক লেনদেন হত, সেই প্রকল্পে তত সহজে অনুমোদন মিলত। নির্ধারিত নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত তলা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ঘুষের বিনিময়ে ছাড় দেওয়া হত বলে দাবি করা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে একটি নির্দিষ্ট পেমেন্ট প্যাটার্নও। সূত্রের দাবি, প্ল্যান জমা দেওয়ার সময়ই মোট অর্থের একটি বড় অংশ (প্রায় ৬০ শতাংশ) দিতে হত। বাকি টাকা অনুমোদন পাওয়ার পরে দেওয়া হত। প্রতিটি প্রকল্পে লক্ষাধিক টাকার লেনদেন চলত বলে প্রাথমিক অনুমান।
সিট আরও জানতে পেরেছে, এই পুরো ব্যবস্থার পিছনে একটি সংগঠিত দল কাজ করত। সেই দলে কিছু লাইসেন্সড বিল্ডিং সার্ভেয়ার, ইঞ্জিনিয়ার, অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের কর্মী এবং কিছু প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী যুক্ত ছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাদের ভূমিকা ও পরিচয় এখন তদন্তের আওতায়।
তদন্তকারীদের দাবি, একাধিক ক্ষেত্রে নিয়ম ভেঙে অতিরিক্ত তলা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যেখানে জমির আয়তন বা রাস্তার পরিকাঠামো অনুযায়ী তা সম্ভব ছিল না। অনেক প্রকল্পে সরেজমিন পরিদর্শনের আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যেত বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র আরও জানাচ্ছে, পুর প্রশাসনের ভিতরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল যেখানে কিছু কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যেতে সাহস পেতেন না। অভিযোগ, চাপ ও প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হত।
তারাতলা এলাকায় একটি নির্মাণ বিপর্যয়ের পর থেকেই এই চক্রের বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়। সেই ঘটনার সূত্র ধরেই বিভিন্ন নথি ও আর্থিক লেনদেনের সংযোগ সামনে আসে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত কালীচরণের ঘনিষ্ঠদের ভূমিকা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত কিছু মধ্যস্থতাকারী ও প্রাক্তন ও বর্তমান পুরকর্মীদের খোঁজে তল্লাশি চলছে। সিট সূত্রে জানা গেছে, পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে আরও সময় লাগবে।
এই ঘটনায় কলকাতা পুর প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী শিবির ইতিমধ্যেই তদন্তের দাবি তুলেছে এবং পুরো বিল্ডিং অনুমোদন ব্যবস্থাকে অডিটের আওতায় আনার কথা বলছে।
অন্যদিকে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, তদন্ত চলছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এই ঘটনায় শহরের রিয়েল এস্টেট বাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



