তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় তহবিল সংক্রান্ত তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে এসেছে বলে দাবি করেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের হদিশ মিলেছে, যা একটি বেসরকারি বিমান পরিষেবা সংস্থা ‘কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশন’ এবং তার সহযোগী সংস্থাগুলির অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়েছিল।
ইডি সূত্রের দাবি, ওই অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে সংস্থাটি একটি চার্টার্ড বিমান এবং একটি অগুস্টা হেলিকপ্টার কিনেছিল। তদন্তকারীদের অভিযোগ, পরে সেই বিমান ও হেলিকপ্টার তৃণমূলের বিভিন্ন নেতা-নেত্রীর সফরের জন্য ভাড়াতেও ব্যবহার করা হতো। ফলে দলীয় তহবিলের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেই লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।
মঙ্গলবার এই মামলার তদন্তে কলকাতা ও সংলগ্ন একাধিক এলাকায় একযোগে তল্লাশি চালায় ইডি। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, রাজারহাট, নিউটাউন-সহ বিভিন্ন জায়গায় একাধিক দলে ভাগ হয়ে অভিযান চালান আধিকারিকরা। তদন্তের মূল লক্ষ্য ছিল চার্টার্ড বিমান ভাড়ার খরচ, সেই অর্থের উৎস এবং দলীয় তহবিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের নথি সংগ্রহ করা।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশন দীর্ঘদিন ধরে ভিআইপি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বিমান পরিষেবা দিয়ে আসছে। তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি, তৃণমূলের তহবিল থেকে সংস্থাটির অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরিত হয়েছিল। সেই অর্থ দিয়ে কেনা বিমান ও হেলিকপ্টার পরবর্তীতে আবার একই রাজনৈতিক দলের প্রয়োজনেই ভাড়ায় ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি বোঝার জন্য সংস্থার মালিক, দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ইডি। পাশাপাশি সংস্থার আর্থিক নথি, ব্যাঙ্ক লেনদেনের বিবরণ, হিসাবপত্র এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তদন্তের অংশ হিসেবে সল্টলেকের একটি সংস্থার কার্যালয় এবং কয়েকজন পরিচালকের বাসভবনেও তল্লাশি চালানো হয়। তদন্তকারীদের দাবি, ওই সংস্থার মাধ্যমে চার্টার্ড বিমান ভাড়া নেওয়া হতো। সেই লেনদেনের উৎস, অর্থপ্রদানের পদ্ধতি এবং হিসাব সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এছাড়া সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ এলাকায় এক চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের দপ্তরেও যান ইডির আধিকারিকরা। সেখানে বিভিন্ন আর্থিক নথি ও হিসাব সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা মনে করছে, এই নথিগুলি আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
ইডি আরও খতিয়ে দেখছে, তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় অ্যাকাউন্টে কোন কোন উৎস থেকে অর্থ এসেছে এবং সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, শিক্ষা নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন সংক্রান্ত অনিয়ম বা অন্য কোনও মামলার সঙ্গে যুক্ত অর্থ দলীয় তহবিলে প্রবেশ করেছে কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র প্রকাশ করা হয়নি।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল চার্টার্ড বিমান ব্যবহারের প্রকৃত ব্যয়। কোন সময়ে কতদিনের জন্য বিমান ভাড়া নেওয়া হয়েছিল, তার জন্য কত টাকা দেওয়া হয়েছিল এবং সেই অর্থের উৎস কী—এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে ইডি। সংস্থার দাবি, উদ্ধার হওয়া নথি এবং জিজ্ঞাসাবাদ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল চার্টার্ড বিমান ব্যবহারের খরচ এবং তার অর্থের উৎস নিয়ে ওঠা অভিযোগকে কেন্দ্র করে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই ইডি আর্থিক নথি সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সংস্থার লেনদেন খতিয়ে দেখা শুরু করে। তদন্তকারীদের মতে, সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তদন্তকারী সংস্থার এই দাবিগুলি এখনও তদন্তাধীন। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে কোনও চূড়ান্ত রায়ও হয়নি। অভিযুক্ত বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে এলে তা-ও তদন্তের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
ইডি জানিয়েছে, আর্থিক নথি, ব্যাঙ্ক লেনদেনের তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণের কাজ এখনও চলছে। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে আরও তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ বা নথি সংগ্রহের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। ফলে এই তদন্ত আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।



