রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার আবহে এবার তৃণমূল কংগ্রেসের আর্থিক সম্পদ ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক দানা বাঁধল। দলের ভিতরে ক্রমবর্ধমান মতবিরোধের মধ্যে প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছে দলের অ্যাকাউন্ট থেকে সমস্ত ধরনের লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর ওই পদক্ষেপের কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘ঋতপন্থী’ হিসেবে পরিচিত ১০ জন বিধায়ক বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে একই দাবি তোলেন।
ঘটনাপ্রবাহের জেরে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে, তৃণমূলের দলীয় তহবিল এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নিয়ে আইনি বা প্রশাসনিক কোনও পদক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে কি না।
বৃহস্পতিবার প্রথমে বিষয়টি সামনে আসে অরূপ বিশ্বাসের একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে। তিনি একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের কলকাতার শাখার কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, দলের বর্তমান পরিস্থিতিতে তহবিলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমস্ত লেনদেন বন্ধ রাখা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, দলের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ তৈরি হয়েছে এবং কে দলের প্রকৃত কর্তৃত্ব বহন করছেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অরূপের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সাংসদ দল ছেড়েছেন এবং কয়েকজন বিধায়কও বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছেন। এই অবস্থায় দলের নামে থাকা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে কোনও ধরনের অর্থ লেনদেন হলে তা ভবিষ্যতে জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। তাই বিরোধ মিটে না যাওয়া পর্যন্ত তহবিলকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই অ্যাকাউন্টে সাময়িক স্থগিতাদেশ প্রয়োজন।
এই চিঠি প্রকাশ্যে আসার পরই রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যায়। বিধানসভায় নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’-এর প্রতিনিধি বলে দাবি করা বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, দলের অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, ওই তহবিলে অবৈধ অর্থ থাকতে পারে এবং সেজন্য অবিলম্বে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা উচিত।
ঋতব্রতের এই মন্তব্যের পর তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ১০ জন বিধায়ক বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের দ্বারস্থ হন। তাঁদের অভিযোগ, দলের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে তহবিলের অপব্যবহার কিংবা বেআইনি আর্থিক লেনদেনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা প্রয়োজন।
তবে এই গোটা বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— অরূপ বিশ্বাস আদৌ দলের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে নিজেকে দাবি করার অধিকার রাখেন কি না।
কারণ, ভোট পরবর্তী পুনর্গঠনের সময় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নতুন সাংগঠনিক কমিটি গঠন করে। সেই কমিটিতে দলের কোষাধ্যক্ষ পদে অরূপের পরিবর্তে শুভাশিস চক্রবর্তীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোয় অরূপের অবস্থান কী, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন দলের নেতাদের একাংশ।
তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষও এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য রেখেছেন। তাঁর দাবি, অরূপ বর্তমানে দলের কোষাধ্যক্ষ নন। তাই ওই পদে থেকে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার কোনও সাংগঠনিক বৈধতা নেই। তাঁর মতে, অরূপের চিঠির বাস্তবিক কোনও গুরুত্ব নেই।
কিন্তু বিতর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না। কারণ, ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো চিঠিতে অরূপ নিজেকে দলের কোষাধ্যক্ষ বলেই উল্লেখ করেছেন। ফলে রাজনৈতিক মহলে নতুন প্রশ্ন উঠেছে— তিনি কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষিত নতুন কমিটিকে কার্যত মানতে চাইছেন না? নাকি দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে নতুন কোনও অবস্থান নিতে চলেছেন?
এই প্রশ্নগুলির এখনও কোনও স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অরূপের পদক্ষেপ তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির গভীর সংকটকেই সামনে এনে দিয়েছে।
ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর থেকেই তৃণমূলের সংগঠন এবং নেতৃত্বের মধ্যে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সমস্ত কমিটি ভেঙে নতুন করে সংগঠন সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। একের পর এক রদবদলের মাধ্যমে তিনি দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে আরও শক্ত করতে চাইছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে দলীয় তহবিলের প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এতদিন পর্যন্ত তৃণমূলের আর্থিক সম্পদের উপর কার্যত কালীঘাটের নেতৃত্বেরই নিয়ন্ত্রণ ছিল। বিরোধী গোষ্ঠীর তরফে প্রকাশ্যে কখনও দলীয় তহবিলের উপর দাবি জানানো হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহে সেই পরিস্থিতিও বদলাতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দাবি বা অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা সহজ নয় বলেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। সাধারণত আদালতের নির্দেশ, তদন্তকারী সংস্থার সুপারিশ বা নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দলীয় অভ্যন্তরীণ বিবাদ মাত্রেই কোনও অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা যায় না।
তবু তৃণমূলের তহবিলকে ঘিরে যে নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দলের অন্দরের ক্ষমতার লড়াই এবার শুধু নেতৃত্ব বা সাংগঠনিক পদে সীমাবদ্ধ নেই; তা পৌঁছে গিয়েছে আর্থিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেও।
অরূপ বিশ্বাসের চিঠি, ‘ঋতপন্থী’ বিধায়কদের অভিযোগ এবং নেতৃত্বের পাল্টা অবস্থান— সব মিলিয়ে এখন নজর রয়েছে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তৃণমূলের কোটি কোটি টাকার তহবিলের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোয়, সেটাই এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়।



