তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, দলীয় প্রতীক এবং বৈধ নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক টানাপোড়েন এখন নির্বাচন কমিশনের দরজায় পৌঁছেছে। দলটির প্রকৃত দাবিদার কোন পক্ষ, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দুই শিবিরের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চেয়েছে নির্বাচন কমিশন।
কমিশনের পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়েছে, আগামী ৬ জুলাই, সোমবার বিকেলের মধ্যে সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষকে নিজেদের দাবি সমর্থনকারী প্রয়োজনীয় নথি ও লিখিত বক্তব্য জমা দিতে হবে। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, উভয় পক্ষের নথি পর্যালোচনার পরই পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে মতভেদ প্রকাশ্যে আসে। নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর দলের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই পরিস্থিতিতে দুটি পৃথক গোষ্ঠী নিজেদেরই দলটির প্রকৃত প্রতিনিধি বলে দাবি করতে শুরু করে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির আগে থেকেই নির্বাচন কমিশনের কাছে জাতীয় কর্মসমিতির একটি তালিকা জমা দেয়। সেখানে তাঁকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আয়োজিত পৃথক বৈঠকে নতুন জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করা হয়। ওই তালিকায় মধ্য হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত করা হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ঋতব্রত শিবিরের জমা দেওয়া তালিকায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম রাখা হয়নি। পরে সেই নতুন কমিটির নথিও নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়।
এরপর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কয়েকজন বিধায়ক ও এক প্রাক্তন মন্ত্রী দিল্লিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর তিনি দাবি করেন, তাঁরাই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত সাংগঠনিক উত্তরাধিকার বহন করছেন। পাশাপাশি দলীয় প্রতীক এবং আর্থিক সম্পদের দাবিতেও তাঁদের অবস্থান শক্তিশালী বলে মন্তব্য করেন।
এই পরিপ্রেক্ষিতেই নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে পাঠিয়েছে। কমিশন জানতে চাইছে, কোন শিবির দলীয় সংবিধান, সাংগঠনিক কাঠামো এবং সদস্য সমর্থনের ভিত্তিতে নিজেদের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করছে। সেই দাবির পক্ষে সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমিশনের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ, ভবিষ্যতে দলীয় প্রতীক, সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য সাংগঠনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এই নথিপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রথম প্রকাশ্যে আসে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। একাংশ শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার পক্ষে মত দিলেও, অন্য গোষ্ঠী সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। পরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের সমর্থনের দাবি তুলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন করা হয়।
সেই ঘটনার পর থেকেই দুই শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বেড়ে যায়। দলীয় সংগঠন, নেতৃত্ব, প্রতীক এবং তহবিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্যে পাল্টাপাল্টি দাবি সামনে আসে। একই সঙ্গে উভয় পক্ষই নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় সাংগঠনিক ও আইনি উদ্যোগ শুরু করে।
এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কমিশন উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং নথিপত্র খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে বলে সূত্রের খবর। তবে এখনও পর্যন্ত কমিশন কোনও পক্ষের দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি।
আগামী সোমবারের মধ্যে দুই শিবিরের লিখিত জবাব জমা পড়ার পর বিষয়টি নতুন মোড় নিতে পারে। কমিশনের সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করবে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক স্বীকৃতি, দলীয় প্রতীক এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে পরবর্তী আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।



